আনোয়ার হোসেন শাহীন ঃ
জীবনে স্বপ্ন ছিলো ভালো একজন শিক্ষক হবেন ।কিন্তু হলেন হোমিও ডাক্তার ।স্বল্প আয়ের শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে চিকিৎসা সেবা দানের অদম্য স্পৃহা তার।পাশাপাশি তিনি লেখালেখির জগতে নিজেকে মগ্ন রেখেছেন ।পিতা মরহুম আবুল কাশেম, যিনি টি,এণ্ড,টি অপারেটর হিসেবে চাকরি করতে ময়মনসিংহের শ্যামগঞ্জে এসে উনিশ শত একাশি সাল থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন । উনিশ শত সাতষট্টি সালে এপ্রিলে গৃহিণী মাতা ফেরদৌসী বেগমের কোলে জন্ম নেন।চার ভাইবোনের একক পরিবারে মধ্যবিত্ত পর্যায়ের টানাপোড়েনেও নিরলস শিল্প সাহিত্য চর্চা করে নিজেকে অদ্যাবধি নিয়োজিত রেখেছেন। নব্বুই দশকে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহনে রসায়ন বিভাগের ছাত্র হয়েও তৎকালীন সাহিত্যাঙ্গনে তিনি নিজেই নিজের আসনকে পোক্ত করতে থাকেন।যদিও লেখালেখির শুরুটা উনিশ শত আটাত্তরে মুক্তাগাছা আর,কে হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন সময়ে ।উনিশ শত উনআশি সালে প্রথম ছড়া লেখেন ” টিয়ে পাখি “।উনিশ শত বিরাশি সালে শ্যামগঞ্জের তরুণ কবি ফকির হারুন আল হেলাল সম্পাদিত ‘রক্তাক্ত গোলাপ ‘দেয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ।উনিশ শত ছিয়াশি সালে ময়মনসিংহের দৈনিক জাহান পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল কবিতা’ ইশারা ‘। দু’হাজার সাত সালে প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বিষন্ন বকুলের কান্না ‘বটমূল প্রকাশনী একুশের বইমেলাতে বের করে ।দু’হাজার আট সালে উপন্যাস ‘পুষ্পিতার নীল সুখ ‘ জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ থেকে বের হলো একুশের বইমেলায়।দু’হাজার চৌদ্দ সালে আবিষ্কার প্রকাশনী বের করে তাঁর লেখা শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘ম্যাঁও ডটকম ‘। গানলেখাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত ।দু’হাজার চৌদ্দ সালে তার লেখা ‘চুইষা খাইলো বাংলার রক্ত ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ময়মনসিংহ জেলার শিল্পীরা পরিবেশন করেন ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসের অনুষ্ঠানে ।অক্টোবর বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে তার লেখা আরো দুটো গান উক্ত শিল্পীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়েছে ।যেগুলো সুর করেছেন আলোকময় নাহা সঙ্গীত বিদ্যায়তনের শিল্পী স্বপন সরকার । বিশিষ্ট নজরুল গীতির শিল্পী আশীষ কুমার সরকার গীত তাঁর লেখা ফোক আঙ্গিকের গান কিছুদিন হলো ময়মনসিংহ শিল্পকলা একাডেমীর পাক্ষিক সঙ্গীত আসরে গাওয়া হয়েছে । জাতীয় পর্যায়ে তার লেখা আধুনিক গান ( শিল্পী কণা কর্তৃক গাওয়া) ডেইলি স্টার এর সেলিব্রেটিং লাইফের অনুষ্ঠানে বিশেষ এওয়ার্ড লাভ করেছে । শ্যামগঞ্জের এলাকার ঐতিহ্য নিয়ে তারই লেখা জারিগান ওখানকার জেনুইন মডেল স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ পরিবেশন করেন যা অনলাইনে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে ।উল্লেখ তিনি এখানে চারুকলার শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। ময়মনসিংহ বিভাগীয় চারুশিল্পী পর্ষদের কয়েকটি প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর আঁকা ছবি।এঁকেছেন ছবি তেল রঙ,জলরঙে,ওয়াক্স কালারে মানুষের মন,আলিঙ্গন, পাখপাখালি, অপেক্ষা, সিডর,ভাঙ্গনের মুখোমুখি, চেতনা। জীবনের ক্ষতি বিক্ষত ক্যানভাসে সবগুলো রঙই তার প্রিয়।তবু নীল রঙে তিনি অপার সৌন্দর্য খুঁজে পান। কার্টুনিস্ট হিসেবে দৈনিক সংবাদ(বাঁশ) ,দৈনিক ভোরের কাগজ (রঙ্গ ব্যাঙ্ক ) পত্রিকার পাতায় তিনি একসময়ে ছিলেন সরব।এখনও তা ধরে রেখেছেন অনলাইনে । তিনি সম্পাদনা করেছেন একাধিক সংকলন, ভাঁজ পত্র, পত্রিকা।উনিশ শত চুরাশিতে শ্যামগঞ্জে হাফেজ জিয়াউর রহমান কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ছাত্রাবস্থায় প্রথম সম্পাদনা করেছেন সহপাঠী মির্জা গোলাম মতিনের সাথে ‘অগ্নিশিখা ‘।তারপর একে একে শ্যামগঞ্জ লেখক সংঘের সাহিত্য সংকলন’অক্ষর’ ‘ ধ্রুবক’। ছাত্র জীবনেই উত্তাল নব্বইয়ের গণ আন্দোলন ভিত্তিক প্রায় বিশটির মতো পথনাটক,গীতিকার নকশা রচনা,নির্দেশনা দিয়েছেন, মঞ্চে অভিনয়েও ছিলেন সক্রিয়।তার রচিত নাটিকা গুলো এখনো এলাকার মুখে মুখে আলোচিত ।উল্লেখ যোগ্য নাটিকা গুলো –‘রক্ত দিয়ে ধোয়া , শেষ দৃশ্য, ডাস্টবিন, পরিবর্তন,সময়ের সীমান্তে ,কান নিয়েছে চিলে, দুঃশাসনের রক্ত চাই,লাঠি, বিধ্বস্ত মহড়া, ছুক্কু মিয়ার জবানবন্দি, কুকুর হইতে সাবধান, অপারেশন থিয়েটার, প্রেসক্রিপশন, নীলনকশা,শুভ্র চেতনা, চাকরি চাই, হাতকড়া, এবার কলম্ভূতের পালা,মিসটেক ইত্যাদি। লেখালেখির জগতে নিজেকে মগ্ন রেখেছেন দেশের আনাচে কানাচে ।সাম্পান,কথন,আন্দর কিল্লা(চট্টগ্রাম ),পানকৌড়ি (পিরোজপুর),বিষের বাঁশি, পুরাতন পাতা (নারায়ণ গঞ্জ)লিখিয়ে,পরাণ(সিলেট ),স্বাধীনতা (সিরাজ গঞ্জ ) ঢাকার ছড়ার কাগজ,আমলকী, সাহিত্য বার্তা, মৌচাকে ঢিল(যায় যায় দিন),ইত্তেফাক (ঠাট্টা )ভোরের কাগজ (পাঠক ফোরাম,অবসর )সংবাদ (আড্ডা,বাঁশ )প্রথম আলো (আলপিন,বন্ধুসভা,তারুণ্য )তে বিভিন্ন সময়ে কবিতা, গল্প, ছড়া ছেপেছে ,।এছাড়াও সূর্য সিঁড়ি, বর্তিকা, অদ্বৈত,অর্জন, স্বরচিত, দৈনিক জাহান, দর্পন, লোক লোকান্তর(ময়মনসিংহ ) নেত্রকোনার অনলাইন পত্রিকা নেত্রকোনার আলো, শোয়াই,মিছিল,(শ্যামগঞ্জ )সাহিত্য পত্রিকা সংকলন গুলোর কথাই মনে পড়ে । শিল্প সাহিত্যের সংগঠন করার প্রগতিশীল ধারার সাথে লেগে আছেন ।ছাত্রজীবন কেটেছে ছাত্র ইউনিয়নে,বর্তমানে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী শ্যামগঞ্জ শাখা সংসদ ও ময়মনসিংহ জেলার সংসদে সক্রিয় ।গৌরীপুর লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক ,প্রগতি লেখক সংঘের সদস্য ।এছাড়াও জলদ, ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের পাঠচক্র প্রকল্প বীক্ষণের প্রাক্তন আহবায়ক, হিসেবেও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে একটু কাজ করার মানসে। আজকাল চিকিৎসা সেবা দানের গুরুত্ব দিতে গিয়ে সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে কোন সীমারেখা নেই বলে মনে করেন ।এটা একমাত্র ইচ্ছা শক্তির ওপর নির্ভর । তাইতো অনেক গুলো অনলাইন পত্রিকা ও গ্রুপে নিরন্তর লিখে চলেছেন আত্মতৃপ্তি নিয়ে । উল্লেখ যোগ্য কিছু অর্জনের কথা না বললেই নয়-ডেইলি স্টার স্ট্যাণ্ডার্ড চ্যাটার্ড ব্যাঙ্ক এওয়ার্ড,ডঃ গোলাম মহিউদ্দিন ফাউন্ডেশন পুরস্কার, শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সেলিনা পারভীন স্মৃতি পুরস্কার, কেয়ার বাংলাদেশ এর সৃজনশীল প্রতিভা অন্বেষণ পুরস্কার তার শ্রমের যথার্থ স্বীকৃতি মাত্র । মা ফেরদৌসী বেগম, স্ত্রী, শিক্ষক ফয়জুন নাহার এবং দুই মেধাবী কন্যাকে নিয়ে একটা সাদামাটা সংসার। লেখক হিসেবে তিনি আত্মপ্রচার বিমুখ । প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত আছেন তিনি।