খানা-খন্দক পুরো সড়কজুড়ে। কোথাও কোথাও গভীর গর্ত। এপাশ-ওপাশ করে হেলে-দুলে চলে গাড়ি। বড় গর্তের ভাঙা ইটে যাচ্ছে গাড়ি উল্টে। কার্পেটিং উঠে ম্যাকাডম নষ্ট হয়ে ‘রঙেমাখা সড়ক’ ধারণ করছে লালচে রঙে। ময়মনসিংহের গৌরীপুর-বেখৈরহাটি আঞ্চলিক সড়কটিতে যানবাহন চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ছে দুর্ভোগ, সরু ব্রিজে ঘটচ্ছে প্রাণহানি।
জানা যায়, গৌরীপুর পৌরশহর সহ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের কয়েক অর্ধলক্ষ মানুষের একমাত্র ভরসা গৌরীপুর-বেখৈরহাটি সড়ক। এছাড়াও নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া, মদন, খালিয়াজুরী ও আটপাড়া উপজেলার হাজার হাজার যাত্রী সড়কটি ব্যবহার করেন। এটি ঢাকা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব-সিলেট যাতায়াতের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, দফায় দফায় মেরামত করা হলেও দুর্নীতি, অনিয়ম আর নিম্নমানের কাজের জন্য টেকসই হচ্ছে না । অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা ছাড়াই সড়ক নির্মাণের ফলে দ্রুত ভাঙছে নির্মিত সড়ক।
সরজমিনে দেখা যায়, গৌরীপুর পৌরসভার জিরোপয়েন্টের পরে গৌরীপুর টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের সামনে পুকুরে সড়ক ধসে গেছে। পূর্বদাপুনিয়া মোড় কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সতিষাগামী সড়কের প্রবেশপথে সৃষ্ট বড়বড় গর্ত যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সতিষা খালের উপর, বালুয়াখদীর উপর ও অচিন্তপুরের ৩টি ব্রিজেই সরু। রাস্তা প্রশস্ত হলেও অর্ধশত বছর আগে নির্মিত এসব ব্রিজ এখন ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বালুয়া নদীর ব্রিজের সন্নিকটে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ’ ভারী যানবাহন চলাচল নিষেধ’ এমন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দায় সেরেছে। অচিন্তপুর ব্রিজে গত ৩বছরে ৫জনের প্রাণহানি ঘটে। অচিন্তপুর গ্রামের সুরুজ আলী জানান, রাস্তা প্রশস্ত ব্রিজটি সরু হওয়ায় সিএনজি সরাসরি খালের মাঝে চলে যায়। কয়েকটি গার্ডার নির্মাণ করলেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর হচ্ছে না।
এদিকে পৌর শহরের বালুয়াপাড়া মোড়টি বিশাল গর্তের কারণে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। অটোরিকশা, সিএনজি ও হ্যান্ডট্রলি প্রায়শ: দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। মালবাহী ট্রাক আটকে যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। চা দোকানদার আমজত আলীর দোকানের সামনে গর্তে ৩-৪ফুট গভীরতা হওয়ায় বিপদজ্জনক হয়ে উঠছে। বালুয়াপাড়া মসজিদের সন্নিকটেও বড়বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগের কারণে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণের নেতৃত্বে সেখানে ভাঙা ইট দিয়ে মেরামত করা হয়। তবে সেই মেরামতও স্থায়ী হয়নি। অনুরূপভাবে গৌরীপুর পৌরসভার উদ্যোগেও প্রায় এক সপ্তাহ আগে আবারও ইট-সুরকী ও বালি দিয়ে গর্ত ভরাট করা হয়। এরপরেও সেখানে কমছে না জনদুর্ভোগ। জেলখানা মোড়, গোলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে, গোলকপুর মোড়, মামুদনগর দোকানের সামনে, মিরিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সন্নিকটে, মিরিকপুর রাইস মিলের সামনে, দারিয়াপুর, অচিন্তপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সামনে, গাগলা গ্রামে, শাহগঞ্জ বাজার মসজিদের সন্নিকটে, আমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বীর আহাম্মদপুর বাজার ও মাওহা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বড় বড় বিশাল গর্তের কারণে সড়কটিতে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও বীর আহাম্মদপুর থেকে বেখৈরহাটি সড়কের গৌরীপুর সীমান্তে বড়-ছোট প্রায় ৩শ গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
গৌরীপুর উপজেলা প্রকৌশলী অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জিওবি প্রকল্পের আওতায় মেসার্স জামির ট্রেডার্স নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ সড়কের সংস্কার করে। সে সময় নির্মাণ কাজের অনিয়ম ও নতুন সড়কে ৮৪টি স্থানে পুন:মেরামত করার বিষয়টি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর একাধিকস্থানে জোড়াতালি দিয়ে সড়কটির নির্মাণ শেষ করে।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সড়কটির গুরুত্ব বিবেচনায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। বালুয়াপাড়া অংশে আরসিসি সড়ক নির্মাণের জন্য অর্ধকোটি টাকার একটি প্রকল্প দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সড়কের যে সকল অংশ ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, সেসব স্থানে জরুরী মেরমাতের আওতায় দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত করারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, সড়টির বিভিন্ন খানাখন্দকে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে যাত্রীসাধারণের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এটি মেরামতের জন্য ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হয়েছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে যাত্রী সাধারণের সুবিধার্থে সাময়িক সময়ের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি।
গৌরীপুর পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা বলেন, সড়কটি এলজিইডির তত্ত্বাবধানে আছে। যেহেতেু সড়কটিতে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে সড়কের খানাখন্দ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সাময়িক সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যেই পৌরসভার পক্ষ থেকে মেরামত করা হয়েছে। এছাড়াও বিষয়টির স্থায়ী সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত আছে।