দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল (পারমাণবিক চুল্লিপাত্র) স্থাপনকাজের উদ্বোধন এর মধ্য দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের শেষ সময়ের নির্মাণকাজ আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। এতে করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মহাস্বপ্ন ছোঁয়ার প্রায় কাছাকাছি এখন বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের এই রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল (পারমাণবিক চুল্লিপাত্র) স্থাপনকাজের উদ্বোধন করেন।
এ সময় প্রধান মন্ত্রী বলেন, কার্বন নিঃসরণ হবে না বিধায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে। এ কেন্দ্র থেকে মানুষের কোনো ক্ষতি হবে না। এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে উত্তরাঞ্চলের মানুষ। এর মাধ্যমে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হবে।
বর্তমানে বিদ্যুৎ সমস্যার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবী এখন গ্লোবাল ভিলেজ। একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। সে কারণে বিশ্বে যখন অর্থনৈতিক মন্দা দেখা যায়, তার ধাক্কা আমাদের ওপরও এসে পড়ে। এজন্য আমাদের কিছুটা সাশ্রয়ী হতে হচ্ছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমাদের বিদ্যুৎ সবাই পাবে না। বিদ্যুৎ সবাই পাবে, পাচ্ছে। তবে কিছুটা মিতব্যয়ী হতে হচ্ছে আমাদের। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে এটা আমরা করতে বাধ্য হচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই, দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি।
দেশে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবদান রাখবে জানিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, আজ বাংলাদেশের জন্য বিরাট অর্জনের দিন। এটা আমাদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য রুশ সরকার এবং বন্ধুপ্রতীম রুশ জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভিভিইআর, জেনারেশন থ্রি-প্লাস রিয়্যাক্টর সমন্বয়ে নির্মিত এই কেন্দ্রের দুইটি ইউনিট থেকে, প্রতি ইউনিটে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। পারমাণবিক প্রযুক্তির মতো একটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিশেষ যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা সৃষ্টি হবে।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, পরমাণু বিজ্ঞানী ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবরসহ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
রসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ ব্যক্তিগতভাবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
এ সময় রসাটম মহাপরিচালক বলেন, প্রতিদিন একটু একটু করে রূপপুর এনপিপি উদ্বোধনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় ইউনিটের রিয়্যাক্টর ভেসেল স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে রসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ আরও বলেন, এক বছর পূর্বে প্রথম ইউনিটে রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেলের স্থাপনের সাক্ষী ছিলাম আমরা; আজকে দ্বিতীয় ইউনিটেও একই বিষয় আবারো প্রত্যক্ষ করলাম। করোনা মহামারিতে সৃষ্ট বিভিন্ন বিপত্তি কাটিয়ে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ সক্রিয়ভাবে এগিয়ে চলছে। নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত পুরো টিমকে তাদের সমন্বিত কার্যক্রমের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। রূপপুর প্রকল্পের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন প্রদানের জন্য আমি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। বাংলাদেশের জনগণ অধীর আগ্রহে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছেন এবং আমরা প্রতিদিনই একটু একটু করে সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি।
রসাটম জানায়, রূপপুর প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের রিয়্যাক্টর কম্পার্টমেন্টে স্থাপিত রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেলটির ওজন ৩৩৩.৬০ টন, দৈর্ঘ্যে ১১.১৮ মিটার, এবং ব্যাস ৪.৫৭ মিটার। কয়েকটি ধাপে স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়। লেইবার ১১৩৫০ হেভি ক্রেনের সাহায্যে রিয়্যাক্টর ভেসেলটি ট্রান্সপোর্ট পোর্টালে স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে একটি বিশেষ পরিবহণ ট্রলির সাহায্যে এটিকে রিয়্যাক্টর কম্পার্টমেন্টের সেন্ট্রাল হলে আনা হয়। অতঃপর পোলার ক্রেনের সাহায্যে এটিকে ভার্টিক্যাল অবস্থায় আনার পর রিয়্যাক্টর শ্যাফটের সাপোর্ট রিং-এ বসানো হয়।
রাশিয়ার এইএম টেকনোলোজি রূপপুর প্রকল্পের জন্য রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল নির্মাণ করে। ইন্সটলেশনের প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি চাহিদা পূরণসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পর এটি ইন্সটল করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দুটি ইউনিটে স্থাপিত হচ্ছে ৩+ প্রজন্মের রুশ ভিভিইআর ১২০০ রিয়্যাক্টর। প্রকল্পটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এই রিয়্যাক্টরগুলো সকল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ করতে সক্ষম।
২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত জেনারেল কন্ট্রাক্টের অধীনে রসাটমের প্রকৌশল শাখা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে।এদিকে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আগত রসাটমের মহাপরিচালক অনুষ্ঠান শেষে রূপপুর এনপিপি সাইটে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। নতুন ও আধুনিক এই কেন্দ্রটিতে রূপপুর এনপিপির পরিচালনার সঙ্গে যেসব বাংলাদেশি যুক্ত থাকবেন তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
বিশেষায়িত শ্রেণিকক্ষ ছাড়াও স্টেট-অফ-দা-আর্ট ইকুইপমেন্ট সজ্জিত বিশেষ স্থাপনায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন বিশেষজ্ঞরা। রুশ পক্ষ এই প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতিগত প্রোগ্রাম প্রণয়ন করেছেন, যা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পক্ষ নিজেরাই তাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হবেন।