ঢাকার শহরে মিশুক চালাতো মোখলেছ। বয়স মাত্র কুড়ি। এরমাঝে বিয়েটাও করে নিয়েছে সে। নতুন জীবনের গল্পটা শুরু করেছিলো সবেমাত্র। সেই গল্পটা অল্পেতে ধুমড়ে-মুছড়ে গেছে। ট্রেনে কেটে শরীর থেকে দু’টি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীর প্রতীক ফুটবল নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামতে পারলেন না তিনি। বরং মুর্হূতের মাঝে এ প্রতিদ্ব›িদ্ধ প্রার্থী জামাল উদ্দিনের সাজানো নির্বাচনের মাঠও তছনছ হয়ে যায়। এ ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সিধলা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে। তবে শ্যামগঞ্জ রেলক্রসিংয়ে দু’টি রেলপথে ৪টি ব্যারিয়েল থাকলেও আজও গেইটম্যান নিয়োগ দেয়নি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (২২জুন/২০২২) উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) এর অর্থায়নে মোখলেছুর রহমানকে হুইল চেয়ার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোফাজ্জল হোসেন খান হুইল চেয়ার বিতরণ করেন। বিতরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান মারুফ। বিশেষ অতিথি বক্তব্য রাখেন ভাংনামারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেজামুল হক সরকার, গৌরীপুর মানবাধিকার কমিশনের সাধারণ সম্পাদক মো. রইছ উদ্দিন।
সেদিন ছিলো মঙ্গলবার। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। ৪র্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উপজেলার সিধলা ইউনিয়নের মেম্বার প্রার্থী জামাল উদ্দিন ও তার সমর্থকরা ফুটবল প্রতীক বরাদ্দ উল্লাস করে বাড়ি ফিরছিলো। প্রতীক পেয়ে অটোরিকশায় ভেঁপু বাজিয়ে ফুটবল ফুটবল স্লোগান মুখরিত। শ্যামগঞ্জ রেলক্রসিং এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশাটিকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যায় প্রায় ২০গজ দূরে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রবিকুল ইসলাম (৪০)। তিনি গৌরীপুর উপজেলার সিধলা ইউনিয়নের পূর্বপুনরিয়া গ্রামের সুরুজ আলীর পুত্র।
অপরদিকে রেললাইনের স্লিপারের উপরে কাটাপড়ে ছিলো এক জোড়া পা। সেই দুটো পা ছিলো মোখলেছুর রহমানের। ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামার আগেই পা হারান তিনি। সেদিন তাকে প্রেরণ করা হয় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে। তিনিও সিধলা ইউনিয়নের পূর্বপুনরিয়া গ্রামের আবু তাহেরর পুত্র। তিনি জানান, ঢাকার শহরে মিশুক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিছুদিন আগে বিয়েও করেন। প্রতিবেশী জামাল ভাই নির্বাচন করবে, শোনে ঢাকা থেকে আসছিলাম। ভাইকে পাশও করাতে পারলাম না, নিজের দুটো পা হারিয়ে আজ পঙ্গু। জামাল ভাইয়ের নির্বাচনের মাঠও তখন খারাপ হয়ে যায়। এ ওয়ার্ডে মেম্বার হয়েছেন মোরগ প্রতীকের মঞ্জুরুল হক।
মোখলেছের বাবা আবু তাহের জানান, ছেলের চিকিৎসার জন্য মানুষের নিকট থেকে ভিক্ষা করেছি। হুইল চেয়ার পাওয়ায় অন্তত নিজে এদিক-সেদিক যেতে পারবে। সে কোনো কর্ম করতে পারে না। শ্যামগঞ্জ রেলক্রসিং এলাকায় গেইটম্যান থাকলে আমার ছেলে পঙ্গু হতো না। এর জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অবহেলা দায়ী। তাই ক্ষতিপূরণ বা ছেলেকে একটি চাকুরী দিয়ে অসহায় পরিবারকে রক্ষার দাবি জানাচ্ছি। ছেলের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ফাতেমা আক্তার। তিনি বলেন, আমার ছেলেটাকে পঙ্গু করে দিয়েছে ট্রেন। তার স্ত্রী রিমা আক্তারকে নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে দিনযাপন করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট দাবি জানাচ্ছি, আমার ছেলেকে একটি চাকরী দিয়ে পরিবারটিকে রক্ষা করুন।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান মারুফ বলেন, মোখলেছের পরিবারকে যতোটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হবে। তার প্রতিবন্ধী জরিপ কার্যক্রম চলমান আছে। ভবিষ্যতে ঘর বরাদ্দ পাওয়া গেলে তাকে একটি ঘরও প্রদান করা হবে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোফাজ্জল হোসেন খান বলেন, প্রতিবন্ধী কার্ড দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে ট্রেন দুর্ঘটনার পরে বিক্ষুব্দ এলাকাবাসী গৌরীপুর-শ্যামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক, শ্যামগঞ্জ-জারিয়া ও নেত্রকোণা রেলপথ অবরোধ করেন। গেইটম্যান দেয়া, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবিতে রেল ও সড়কপথ অবরোধ করেন। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অস্থায়ীভাবে গেইটম্যান প্রদান করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সেই গেইটম্যান মাত্র ২দিন ছিলেন। দুর্ঘটনায় আহত অন্যরা হলেন পুর্বপুনরিয়া গ্রামের হাসিম উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন (২৫), হযরত আলীর ছেলে কিরন মিয়া (৩০), চাঁন মিয়ার ছেলে স্বপন মিয়া (৩২) ও কছম উদ্দিনের ছেলে সজিব (১৮)।
শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক গোবিন্দ বণিক জানান, তাৎক্ষনিক গেইটম্যান দিয়ে আন্দোলন থামানো হয়। এরপরেই আবার তাকে সরিয়ে নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এলাকাবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং রেলক্রসিংকে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ করা হয়েছে।