মোখলেছুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টার
কখনও বাড়ির আঙিনায়, ক্ষেতের আল পথে, কখনও বা খাল-বিলের ঝোপঝাড়ে, নয়তো পরিত্যক্ত পুকুরের পাড়ে গজিয়ে ওঠা কচুগাছে যে লতা জন্মে তা কুড়িয়েই তার সময় চলে যায়। সারাদিন ধরে লতা কুড়িয়ে ঘরে জমিয়ে রাখে। পরের দিন পরিষ্কার করে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে সংসারের জন্য চাল ডাল কিনে দু’মুঠো ভাতের যোগান দেয় সে। এভাবেই চলে তার সংসার। বলছিলাম ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ২ নং গৌরীপুর ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামের সুশীল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী লক্ষ্মী রানী বিশ্বাস’র (৩২) কথা। তিনি লতা কুড়িয়ে বাজারে বিক্রি করে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচসহ সংসারের যাবতীয় খরচ বহন করেন। স্বামী ১০ বছর ধরে মানসিক রোগী হয়ে গৃহবন্দী জীবন যাপন করছেন।
লক্ষ্মী রানীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০৫ সালে সুশীল চন্দ্র্র বিশ^াসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পরের বছর তার কোল আলোকিত করে ঘরে আসে নতুন অতিথি বৃষ্টি রানী বিশ^াস। স্বামী সুশীল চন্দ্র বিশ্বাস দর্জির কাজ করতেন । সন্তানের মুখ দেখে সুশীল চন্দ্র বিশ^াস কাজের মাত্রা আরোও বাড়িয়ে দেন। হঠাৎ তার স্বামী আবোল-তাবোল বলতে শুরু করায় প্রথমে ভেবেছিলো বিষয়টি স্বাভাবিক। পরে বুঝতে পারে যে তার স্বামী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। এভাবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় প্রথমে হাতের জমানো টাকা খরচ করেও স্বামীকে সুস্থ করতে পারেনি। অবশেষে সুশীল চন্দ্র বিশ্বাসের চিকিৎসার জন্য পিতৃপ্রদত্ত ৮০ শতাংশের পুরোটাই ধীরে ধীরে বন্দক দিয়ে সেই টাকায় চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু সুশীল চন্দ্র বিশ্বাস এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেনি। মাঝে মাঝে সুস্থ থাকলেও বেশির ভাগ সময়ই মাথায় গোলমাল দেখা দেয়। তখনই শুরু হয় নানা বিপত্তি। আর তাই সারাদিন তার নজরদারি করতে হয়।
এদিকে সংসারের খরচ চালাতে অন্য কোনো উপায় না পেয়ে লক্ষ্মী রানী তার স্কুল পড়ুয়া মেয়ে বৃষ্টি রানী বিশ্বাসকে নিয়ে লতা কুড়াতে বের হন। শীতকালে যখন মাঠ-ঘাট শুকনো থাকে তখন লতা কুড়ানো গুটিয়ে রেখে বিয়েসাদীর অনুষ্ঠানে বাবুর্চির সহযোগী হিসেবে কাজ করে কিছু আয় করেন। এছাড়াও এলাকায় প্রসূতি মায়ের সেবা যত্নের জন্যও তার ডাক আসে।
লক্ষ্মী রানীর ২টি মেয়ে ও ১টি ছেলে সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে বৃষ্টি রানী বিশ্বাস উপজেলাধীন অগ্রদূত নিকেতন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের জেএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট মেয়ে সৃষ্টি রানী বিশ্বাস স্থানীয় ঘোষপাড়া পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে এবং একমাত্র ছেলে সুদাম চন্দ্র বিশ্বাস সবে মাত্র বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। বয়স ৬ এর কাছাকাছি।
লক্ষ্মী রানী বিশ্বাস ছোট মেয়ে সৃষ্টি রানীকে নিয়ে সারাদিন লতা কুড়িয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। বাড়িতে বড় মেয়ে বৃষ্টি রানী ও তার বাবা মিলে সেই লতা পরিষ্কার করে রাখে। পরে ছোট মেয়ে এগুলো নিয়ে বাজারে বিক্রি করে। শুধু লতা বিক্রি করে স্বামীর ওষুধ ও সংসারের খরচ চালাতে না পেরে বেসরকারি সংস্থা থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ছোট গরু ক্রয় করে বাকি টাকা দিয়ে স্বামীর চিকিৎসার কাজে ব্যয় করেন। এখন প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ৩ শত টাকা করে কিস্তি দিতে হয়।
তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমার মেয়ে লতা কুড়িয়ে এনে আমাদের তরকারির চাহিদা মেটাতো। আস্তে আস্তে আমিও তার সাথে লতা কুড়ানোতে যোগ দেই। লতা কুড়িয়ে এনে বিক্রি করার জন্য প্রথমে আমাকে অনেক নিন্দা সইতে হয়েছে। কিন্তু এখন আমি তাদের কথা আর গায়ে মাখিনা।’
লতা বিক্রি করে লক্ষ্মী রানী প্রতিদিন ২ থেকে ৩ শত টাকা আয় করেন। অর্থনৈতিক ভাবে বিপাকে পড়ায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো সহযোগিতা পায় কিনা এমন প্রশ্ন করলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, তিনি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো ধরণের সহযোগিতা পাননি।