বাহাদুর ডেস্ক :
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) করোনা ইউনিটে চাপ বাড়ছে রোগীর। এখানে জরুরি বিভাগের সামনে কিছুক্ষণ পরপরই রোগী আসছে অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজি অটোরিকশাসহ নানা যানবাহনে। শুধু রাজধানী নয়, বাইরের অনেক জেলার গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিয়েও আত্মীয়স্বজন এখানে ছুটে আসছেন একটু ভালো চিকিৎসার আশায়। তাদের অনেককেই নিয়ে আসতে হচ্ছে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে। অন্যদিকে গুরুতর অসুস্থ অনেক রোগী ভর্তি হয়েও হাসপাতালটি ছেড়ে যাচ্ছেন আইসিইউতে সিট না পেয়ে। গতকাল শনিবার ঢামেকের করোনা ইউনিটে গিয়ে এসব দৃশ্য দেখা গেছে।
নাসিমা বেগমকে ঢামেকে ভর্তি করাতে নিয়ে এসেছেন তার রিকশাচালক স্বামী সোহরাব মিয়া। তাদের বাড়ি মাদারীপুর হলেও থাকেন গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি টিনশেডের ভাড়া বাসায়। নানা অসুস্থতা নিয়ে এর আগে নাসিমা মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও করোনা শনাক্ত হওয়ায় ডাক্তাররা তাকে ঢামেকে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। সিএনজি অটোরিকশা থেকে নামলে একজন ওয়ার্ডবয় এসে হুইলচেয়ারে করে জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে যান নাসিমাকে। সোহরাব মিয়া যান টিকিট নিতে। তবে রোগীর চাপ থাকায় হুইলচেয়ার থেকে নামতে হয় তাকে। দুর্বল শরীরে দাঁড়ানোর শক্তি পাচ্ছিলেন না। মেয়ে দোলা তাকে শুইয়ে দেন হাসপাতালের প্লাস্টিকের চেয়ারে। সেখানে শুয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নিরুদ্দেশ, যেন বলার কিছু নেই।
নাসিমা বেগমের চার মেয়ের মধ্যে একমাত্র দোলাই এসেছেন মায়ের সঙ্গে। পাশে বসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন মায়ের মাথায়। জরুরি বিভাগের বাইরে কাঁথা-বালিশ নিয়ে দাঁড়ানো নাসিমার মা আলেয়া বেগম। একমাত্র মেয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে মাদারীপুর থেকে ছুটে এসেছেন ঢাকায়। বললেন, ‘অনেক ডাক্তার দেখিয়েও মেয়ের রোগ ধরা পড়েনি। পরে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করলে পরীক্ষা করে তারা জানায়, তার পেটে ঘা (আলসার) হয়েছে। সেখানে মেয়েটা ছয় দিন ধরে ভর্তি ছিল। মাঝেমধ্যে জ্বর আসায় ডাক্তার করোনা পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন। পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ আসায় এখানে নিয়ে এসেছি।’
এমন সব গুরুতর রোগীই আসছিলেন ঢামেকের করোনা ইউনিটটিতে ভর্তি হতে। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় অন্তত দশটি অ্যাম্বুলেন্স জরুরি বিভাগে এসেছে করোনার উপসর্গ থাকা বা শনাক্ত হওয়া রোগী নিয়ে। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ওয়ার্ডে।
আবার উম্মে হানির মতো অনেক রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে জরুরি বিভাগ পর্যন্ত নিতেই অক্সিজেন দিতে হচ্ছিল সিলিন্ডার থেকে। মাদারীপুরের টেকেরহাট থেকে তাকে সরাসরি ঢামেকে নিয়ে এসেছেন তার স্বামী মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান। উম্মে হানির দেবর আনিসুর রহমান জানান, তার ভাবি গতকাল রাত থেকেই অক্সিজেনের স্বল্পতায় ভুগছিলেন। এর আগে চার দিন ধরে জ্বরসহ করোনার উপসর্গ নিয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। পরে পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়। বাড়ি থেকে অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে। তবে পরিবারের অন্যদের করোনার উপসর্গ নেই বলেও জানান তিনি।
সংশ্নিষ্টরা জানান, করোনা রোগীদের আইসিইউ সেবা দিতে বেড সংখ্যা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে ঢামেকে। আইসিইউ বেড সংখ্যা বাড়ানো না গেলে সামনের দিনগুলোতে অনেক জটিল রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢামেকে ঘুরে দেখা গেছে, এখানে আইসিইউতে সিট না পাওয়ায় করোনা আক্রান্ত অনেক রোগীকেই অন্য হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। গোপালগঞ্জ থেকে আসা করোনায় আক্রান্ত সত্তরোর্ধ্ব সালেহা বেগমকেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল উত্তরার একটি হাসপাতালে। তার আত্মীয় সামিউল ইসলাম জানান, সালেহা গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। কয়েকদিন ধরেই তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। পরে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে গত শুক্রবার ঢামেকের করোনা ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়। এখানকার ডাক্তাররা রোগীকে আইসিইউতে স্থানান্তর করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে এখানে আইসিইউর কোনো বেড খালি না থাকায় উত্তরার ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাকে আইসিইউতে রাখা হবে।
সামিউল দুঃখ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউর একটা সিট ম্যানেজ করতে পারলে আমাদের অনেক কম খরচ হতো। বেসরকারি হাসপাতালে অনেক বেশি খরচ। তবে রোগীকে বাঁচাতে এর বিকল্পও নেই। এখন এত খরচ কতদিন টানতে পারব, বুঝতে পারছি না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ঢামেকে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ২০টি আইসিইউর সবগুলো করোনা রোগীতে পূর্ণ হয়ে আছে। এ ছাড়া করোনা ইউনিটের ৭০৫টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ২৯৫টি। জুনের ৪ তারিখে করোনা ইউনিটে প্রায় সোয়া চারশ শয্যা খালি ছিল বলে জানায় অধিদপ্তর। এই হাসপাতালে হাইফ্লো নেজাল ক্যানুলাসহ আইসিইউ সমতুল্য শয্যা আছে ৯৫টি।
টি.কে ওয়েভ-ইন