বস্তির উত্তরদিকে লোকজনের জটলা । খাদে ওরা বকুলির লাশ দেখছে । দুটু স্তনই কাটা । গায়ে অনেকগুলো ছুরির আঘাত । কাঞ্চনি আঁৎকে ওঠে এবং আঁচলে মুখ ঢেকে এ স্থান ত্যাগ করে । সে ঠিকই বোঝতে পারে ওরা ছাড়া কেউ না । ওরা তার কাছেও চাঁদা চেয়েছিলো । কাঞ্চনি বলেছিলো, মাইনসের বাসায় কাম কইরা খাই, সুরকি ভাইঙ্গ্যা রোজগার করি, পেটই পালতে পারি না, টেহা দেম কোহান্তনে ? ওদের দুটো কথা, হয় ফস্টিনস্টি দে নয় ইয়াবা বেচতে লাগ । কাঞ্চনি চিন্তায় পড়ে যায় । একটু ভাবতে সময় নেয় আর বকুলি ইয়াবা বেচতে লেগে যায় ।লোভই বকুলির মৃত্যুর কারণ, ওদের সাথে বিরোধের জের । কাঞ্চনি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয় এ স্থান ত্যাগ করতে হবে, জীবন এখানে নিরাপদ না ।
কাঞ্চনির সুঠাম শরীর, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ।সুযোগমতো একদিন শহর থেকে পালিয়ে গ্রামে ঠাঁই নেয় । গ্রামে ভিটেটাই তার সম্বল যেখানে হেলেপড়া একটা খড়ের ঘর আছে । অধিক রোজগারের ধান্দায় সে শহরে গিয়েছিলো, আজব জায়গা, টাকা ওখানে শিমুল তুলার মতো ওড়ে । টাকা নিয়ে সেখানে খুব কাড়াকাড়ি তাই এতো খুনোখুনি আর ইট-সিমেন্টের রাজ্যে মানুষ যেনো দম দেয়া এক কলের পুতুল ।
শহরে কাঞ্চনি বাবুলের মতো কাউকে পায়নি অথচ হামিদের কোন অভাব নেই । হামিদ কাঞ্চনিকে বিয়ে করবে, এ কথাটা গ্রামশুদ্ধ বলে বেড়াচ্ছে । কষ্টের সেতু বেয়ে সে যে সামান্য কিছু অর্থ জমিয়েছে সেটা হাত করতেই লম্পট হামিদের এহেন কৌশল ঠিকই বোঝতে পারে কাঞ্চনি । অথচ বাবুল কখনো কাঞ্চনির টাকার গন্ধ শুকতে আসেনি । সে কাঞ্চনিকে গভীরভাবে ভালোবাসে । তাই তার রূপের নগ্ন প্রশংসা করে না । তাকে নিয়ে কতো স্বপ্ন দেখে । খুশিতে তাই ভরে ওঠে কাঞ্চনির মন ।
কাঞ্চনি তার জমানো টাকাগুলো আর সায়ার পকেটে বয়ে বেড়াতে চায় না । সে পাতলা টিন দিয়ে বাঁশের কাপ-কুড়োতে একটা সুন্দর ঘর বানায় । দেখে বাবুল খুব খুশি হয় যা কাঞ্চনির হৃদয় স্পর্শ করে । সে পরিকল্পনা মাফিক এগোয় । হাঁস-মুরগি, ছাগল কেনে । বাড়িতে কেরসিন কাঠের বাক্সে ছোট দোকান সাজায়, পান-জর্দা-বিড়ি-সিগারেট-সুপারি-পেয়াজ-রসুন-তেল-মরিচ-চাল-ডাল-নুন সহ নিত্য প্রয়োজনীয় নানা আইটেম দিয়ে । পথের পাশে বাড়ি হওয়ায় সে উড়ন্ত কাস্টমার পায় আর প্রতিবেশীরাতো রয়েছেই । ক্রমশ দোকান জমে ওঠে । আয় বাড়তে থাকলে সে লক্ষ্যের দিকে এগুতে থাকে । কাস্টমারদের মধ্যে বেশিরভাগের আচরণই স্বাভাবিক, তবে কিছু আছে যারা অহেতুক বসে থাকে বা বারতি কথা বলতে চায় । কাঞ্চনি সব বুদ্ধি দিয়ে অতিক্রম করে ।
শহরের আতঙ্কের দিনগুলো ভুলতে চায় কাঞ্চনি । বাবুলকে ঘিরে সোনালি স্বপ্ন বুনে ।বাবুল প্রায়ই আসে মোবাইলে গান বাজিয়ে বাজিয়ে । কাঞ্চনির সাথে যোগাযোগের এটি মাধ্যম । মোবাইল থেকে কাঞ্চনিকে অনেক খবর শোনায়, এই যেমন, সিরিয়ায় বোমা হামলায় একসাথে দুশ মানুষ মারার খবর । শোনে কাঞ্চনি শিউরে ওঠে । বকুলির লাশ চোখের সামনে ভেসে ওঠে । বাবুল প্রসঙ্গ পালটায় । কাছে ঘেষে বসে মুচকি হাসে, মুখের দিকে অপলক চেয়ে থাকে । চোখ নাচিয়ে, ঘুরিয়ে কাঞ্চনি প্রশ্ন করে, এমুন করে কী দেহস ? তরে, আমার ময়না পাখিরে, জবাব দেয় বাবুল । কাঞ্চনি দিল খোলে হাসে, তরে লইয়া মরচি, তুই শহরেও ধাওয়া করতিস, কী পাচ আমার মাঝে ? পাইরে, হেইডা বুঝান যাইবো না, তুইযে আমার পরান ভমরা – বলে বাবুল । শুনে কাঞ্চনি অনেকটা সময় ধরে হাসে উচ্চস্বরে । এ হাসি বাবুলকে দ্বন্দ্বে ফেলে, এটা উপহাস, তিরস্কার না খুশি বোঝতে পারে না । সে চোখের কাছে চোখ এনে কেশের গন্ধের সীমানায় বোকার মতো চেয়ে থাকে । কাঞ্চনি সিরিয়াস হয়, আমার সব জাইনা আমারে চাস ? বাবুল দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেয়, হ্যাঁ ।তাইলে জুয়াডা ছাড় – বলে কাঞ্চনি । উত্তরে বাবুল এমন শান্তভাবে কাঞ্চনির দিকে চায় যে জুয়ো ছেড়ে দেবে এ ভাবটিই ফুটে ওঠে, বলে, যাইরে কাঞ্চনি কাইল আইয়ামনে । বাবুল চলে গেলে কাঞ্চনি সারাক্ষণ ওর কথা ভাবতে থাকে ।
নিত্য ভোরে কাঞ্চনির ঘুম ভাঙ্গে । পাখির কলগান, শীতল হাওয়ার স্পর্শ, সূর্য ওঠার লালচে-হলুদ প্রস্তুতি তাকে আন্দোলিত করে । সে কর্মচঞ্চল হয় । উঠোনে পলিথিন বেগে করা গাছের চারায় পানি ঢালে । আঙ্গিনার সব্জিবাগান পরিচর্যা করে । ছাগল মাঠে দেয় । হাঁস-মুরগিগুলোকে খাবার দেয় । দোকানের বাক্সের উপর আগরবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে পাক বসায় ।
জীবনের পথ যে কঠিন কাঞ্চনি তা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আঁচ করতে পেরেছে । সুখ অরণ্য পেরিয়ে সাপ-বিচ্ছুর ঠোঁট থেকে আনতে হয় । কাঞ্চনি সুখ চায় বাবুলকে বুকে চেপে রেখে । সে ফুটফুটে একটি মুখ চায় । স্বপ্নের পর সপ্নের বীজ বুনতে থাকে হৃদয়ের কোমল মাঠে । শিহরণে শিহরণে অন্তর ভরে ওঠে । বুজে আসে কাঞ্চনির চোখ । পাতলা অধরে ফুটে ওঠে এক অনাবিল হাসি । আবেশে আবেশে দিনটা কেটে যায়, আসে রাত । তারপর বিছানার আশ্রয়ে একসময় শরীর পাতলে নিবিঢ় ঘুম নেমে আসে চোখের পাতায় ।
রাতের শেষ প্রহরে গুলির শব্দে কাঞ্চনির ঘুম ভেঙ্গে যায় । পর পর বেশ কয়টি গুলি হয়, কিছুই বোঝতে পারে না সে । পশ্চিম দিকে কলরব শুনা যায় । চোখে ঘুম জড়িয়ে থাকে । আবার সে ঘুমিয়ে যায় । সকালে হামিদ আসে । খবর দেয়, গতরাত সরিষাহাটি মড়লবাড়িতে ডাকাতি হয়েছে । দুর্ধর্ষ ডাকাতি । ডাকাতরা খুব মারধর করেছে, টাকাপয়সা সোনাদানা সব নিয়ে গেছে । ভীতিপ্রদ খবরটা ছুঁড়ে দিয়ে হামিদ কাঞ্চনির মুখের দিকে চেয়ে থাকে তার প্রতিক্রিয়া জানার উদ্দেশে । নিরোত্তর কাঞ্চনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে । কিন্তু হামিদ দমে না, বলে, আমার ভাবনা তরে লইয়া । একলা তাহস, বলা তো যায় না কিছু একটা যদি হয়া যায় ! কাঞ্চনি কটমটিয়ে চায়, বলে না কিছু । হামিদ চালিয়ে যায়, দেখ্ পাত্র হিসাবে আমি ফেলনা না, শহরের বড় নেতা আমারে বন্ধু কয় । আল্লায় দিলে রোজগারও ভালাই, তর সুখ অইবো, আমারে মাইনা নে । এসব শুনে কাঞ্চনির মাথাটা গরম হয়ে ওঠে, সে একটা আগুনে চাউনি দেয় । এতে হামিদ পরিবেশটা বদলাতে চেষ্টা করে, বলে, ঠিক আছে একটা চুরুট দে, মাথা জাম ধরছে । রাগস ক্যান আমার কথাডা একবার ভাইবা দেখ, সুখি অইবি ।
কাঞ্চনি দোকান থেকে একটা চুরুট এনে বলে, নে বিদায় হ, অহন আমার মেলা কাম । হামিদ চলে যায় । কাঞ্চনি রাগে জ্বলতেই থাকে । খারাপ, হালায় হারামির আড্ডি একটা । ভাবে, বাবুলের সাথে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে হবে । সারাদিন কাঞ্চনির খারাপ কাটে, দুশ্চিন্তায় পার হয় । কিন্তু রাতে তার মনটা ভালো হয়ে যায় বাবুল আসবে, বন্ধু আসবে বলে ।শহরে কাঞ্চনি দেখেছে মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়, ফুটপাথে পড়ে থাকে । কেউ ময়লার স্তূপের ধারে রান্না বসায় ।আবার কেউ নদীর চরে সংসার পাতে । দেখেছে দুটু পা নেই মানুষও বাঁচার জন্য লড়াই করে । টগবগে কাঞ্চনি, টানা-টানা চোখের কাঞ্চনিও বাঁচতে চায়, সামনের দিকে এগুতে চায় অনন্ত আনন্দের ঠিকানায় ।
বাবুলের জন্য কাঞ্চনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে । গোছগাছ করে, হাঁসগুলোকে রাতের খাবার দেয় । শিয়াল-বাঁদরের খুব উৎপাত তাই খোয়ারের দরজাটা ভালো করে লাগায় । ছাগলের তলটা পরিষ্কার করে । তারপর সাবান দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে । শুঁটকি আর লালশাক দিয়ে পেট পুরে খায় । বাবুলের আসার পথের দিকে চেয়ে থাকে কিন্তু আসে না । ফোনে পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় । সুইচ অফ । সুতরাং আজ আর আসার সম্ভাবনা নেই । কপাটটা ভালো করে লাগিয়ে কুপি বাতিটা নিবিয়ে কাঞ্চনি শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয় । ধীরে ধীরে সে নিদ্রার দখলে চলে যায় ।
অনুমান গভীর রাত হবে কেউ একজন কাঞ্চনিকে চুরুটের জন্য ডাকে । কাঞ্চনি পারবে না বলে দেয় । আবার ডাকে । এবার সে রেগে যায়, বলে, হুনচ না পারতাম না কইচি । তারপর ধরাস্ করে একটা শব্দে ওরা কাঞ্চনির কপাট ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে । ওরা সংখ্যায় অনেক এবং টর্স ধরে অনেকগুলো । কাঞ্চনি হামিদকে ঠিকই চেনে এবং ইয়াবার সেই লোকটাকে । অন্যেরা অচেনা । ভয়ে কুঞ্চিত হয়ে যায় কাঞ্চনি । থরথরিয়ে কাঁপতে থাকে । তার গলা শুকিয়ে যেতে থাকে, ঘন ঘন জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজায় সে । ওরা দ্রুত কাঞ্চনির মালামাল দিয়ে পুটলি করে, টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয় । পরে গরিলার মতো কালো লোকটা কাঞ্চনিকে হেচকি টানে কাঁধে তুলে বাইরে বেরিয়ে পড়ে ।
কাঞ্চনিকে ওরা মধ্যমাঠে পুরুনো বট গাছটার নিচে নিয়ে যায় । নির্জন রাতের গভীর অন্ধকারে একদল নেকড়ের পৈশাচিক উৎসব জমে ওঠে । কাঞ্চনির পৃথিবী হেলিকপ্টারের পাখার মতো ঘুরতে শুরু করে । প্রিয় বাবুলের মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তারপর ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যায় । স্বপ্নের সব ইমারত মুহূর্তে হুড়মুড়িয়ে ধ্বসে পড়ে মাটির ওপর । চারপাশটা আরো ঘুটঘুটে অন্ধকার ঢেকে ফেলে । কাঞ্চনি জ্ঞান হারায় ।
প্রতিদিনের মতো সকাল হয় । বনে ফুল ফুটে । গাছে গাছে পাখি গান ধরে । জীবনকে তাপ দিতে পুব আকাশে সোনার থালার মতো সূর্য উঁকি দেয় । গ্রামের মানুষ মাঠে নেমে পড়ে আর শিশুরা আঙ্গিনায় আঙ্গিনায় মেতে ওঠে খেলায় । পুষ্পমন কাঞ্চনি শুধু বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী মাঠের প্রাচীন বট গাছটির নিচে গোঙ্গাতে থাকে ।