গণকবি। তিনি পরিবর্তনের পক্ষে, আমূল পরিবর্তন। শ্রম আনে পরিবর্তন। আর প্রেম হচ্ছে শিল্পের মৌল বিষয়। এসব মিলিয়েই একজন গণকবি। আমরা তাঁর বিষয়েই বলতে চাই। বিপ্লবী গণকবি তাঁর কাজের জায়গাটিকে অর্থাৎ তিনি যেখানে থেকে কাজ করছেন সে সম্পর্কে উত্তম করে উপলব্ধি করবেন কারণ তাঁর অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, আমরা যাকে জ্ঞান বলি। তিনি হবেন সচেতন কবি। তাঁকে কবিতা লেখতে হবে স্বদেশ ও বিশ্বকে সামনে রেখে। কবিতায় থাকবে লোকায়ত পরিবেশ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য। তিনি এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ থাকবেন।
তাঁর কবিতায় থাকবে দেশের প্রতি ভালোবাসা। থাকবে মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার চেতনা, মেহনতি মানুষের মুক্তি সংগ্রাম। হৃদয়ে গোলাপের মতো সতেজ সজীব থাকবে মানবমুক্তির আদর্শ। বোধে থাকবে আন্তর্জাতিকতা। তাঁর কবিতা হবে চেতনার আয়না। এই আয়নাতে সংগ্রাম ও সাধনার বিস্তারিত ঐতিহাসিক রূপটি প্রতিফলিত হবে। কবির কণ্ঠটি হবে গভীর শান্ত, উদাত্ত ও উচ্চকিত। দুনিয়ার সকল মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠের মতো বলিষ্ঠ। তিনি হবেন জীবন ও যৌবনের অনুরাগী, শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
কবি প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে শিখবেন ঠিকই কিন্তু তাঁর প্রকৃত বিদ্যালয়টি হবে প্রকৃতি, সমাজ ও অর্থনৈতিক প্রণালি। তিনি মেহনতি মানুষের সাথে থাকবেন, তাদের লড়াইয়ের সাথে থাকবেন। শিখবেন কৃষকের, শ্রমিকের, মেথর, মুছির নিকট থেকে। তিনি নির্বাচনী লড়াই থেকে শিখবেন, শিক্ষার জন্য জনপদ থেকে জনপদে যাবেন। সুযোগ থাকলে দেশের বাইরেও যাবেন। জানার জন্য তিনি আধুনিক সকল মাধ্যম ব্যবহার করবেন। কবি যেখানে উপস্থিত হবেন সেখানে আলোড়ন হবে কারণ তিনি গণমানুষের হয়ে বলেন, নজরুল-সুকান্তের বেলায় এমনটা হতো। তিনি হবেন প্রিয়তম জনগণনেতা। তিনি মানবমুক্তির মাঠে নিজেকে বিলিয়ে দেবেন, মেহনতি মানুষের একজন হয়ে যাবেন। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে ভালোবাসবে, আদর করবে। তাঁর কবিতা ও কাজ একত্রে জড়িয়ে থাকবে। তিনি হবেন মানবমুক্তির চারণ কবি।
কবি দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, মহামারি ইত্যাদি দুর্যোগে লেখক-লেখিকাদের সংগঠিত করে কর্মযজ্ঞ চালাবেন। কারণ মানুষের জন্যই মানবতার প্রতিষ্ঠা। এটা একা মানবতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। তিনি সাধারণভাবে সব শিল্পরূপের জমায়েতের জন্য কাজ করবেন। তাঁর লক্ষ্য হবে মানুষের পরিত্রাণ এবং শিল্পের প্রসার। তিনি মানুষের দৃষ্টির সামনে আলো প্রদর্শিত করবেন, আশার প্রদীপ সর্বদা জ্বালিয়ে রাখবেন।
কবি সময়কে প্রতিনিধত্ব করে এমন রীতিতেই কাজ করবেন। তিনি প্রচলিত রীতি থেকে এগিয়ে যেতে পারেন কিন্তু পিছিয়ে নয় কারণ তিনি প্রগতির পক্ষে। তিনি আধুনিক ভাবনায় চর্চা করবেন, গতিশীলতাকে মূল্যায়ন করবেন। কবির কবিতায় জাতীয় সংস্কৃতি ফুটে ওঠবে আন্তর্জাতিকতার অংশ হয়ে। এটা আরো সহজ করে বলা যায়, দেশের ভেতর পৃথিবীর সন্ধান মিলবে।
গণকবির কবিতায় ওঠে আসবে সমুদ্র, পাহাড়, নদী, মেঘ, সূর্য, চাঁদ, ফসলের মাঠ, চিমনির ধোয়া অর্থাৎ পুরো প্রকৃতি এবং এর সাথে সমাজ ও চেতনার ঘটবে মিথষ্ক্রিয়া। ফলে রূপ নেবে নতুন শিল্পের। ভাবনায় কাঁচাভাব থাকবে না, তিনি ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে উপস্থাপন করবেন। এখানে অভিজ্ঞতার কথা বলা হলো। কবি বাস্তবের পথে হেঁটে তা অর্জন করবেন। ভাঙ্গার কথা বলবেন নতুনকে গড়ার উদ্দেশ্যে।
‘করোনা’ পরিস্থিতি আজ সাম্রাজ্যবাদকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। এখান থেকে উত্তোরণে সে এখন একটি যুদ্ধ চায়। এরকমই তার পায়তারা। যুদ্ধ মানবতার শত্রু, সাম্রাজ্যবাদও তাই। সুতরাং আজকের গণকবি যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। কবি, কলমযোদ্ধা কলম চালাবেন সাম্রাজ্যবাদের অমানবিকতার বিপক্ষে। তিনি পৃথিবীর সব গণশিল্পীদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলবেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে রোঁমা রোলাঁর নেতৃত্বে যেমনটা হয়েছিলো। তখনকার ভারত উপমহাদেশের উর্দু কবি মখদুমও শিল্পীদের সংগঠিত করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদকে নিয়ে তাঁর সাবধানবাণী ছিলো-
“সেই হাত এখনও সক্রিয় রয়েছে
যে হাত কাউকে বা বিষ খাইয়েছে
কাউকে বা ক্রুশে চড়িয়েছে
সেই হাত যা সিনাই উপত্যকায়, ভিয়েতনামে থাবা বসিয়েছে।”
গণকবি বস্তুতপক্ষে প্রকৃতি ও জনগণকে মাধুর্য-নবসৃষ্টি-আশাবাদ থেকে বাইরে দেখবেন না। তিনি দুঃখী মানুষদের সাথে নিচতলায় থেকে মানবজীবনের গভীর ও সমৃদ্ধ অর্থময়তাকে উপলব্ধি করবেন ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে। তিনি শ্রমের সাথে প্রেমকে যুক্ত করবেন এবং সৃষ্টি হবে অমর শিল্প।
১১/০৬/২০২০ খ্রিঃ।