বাস্তব পরিবেশ আর সাহিত্যিকের কল্পলোক এক না। আদি শিল্পীরা বাস্তবকে দেখতেন, তারপর নিজের মতো করে কল্পনা করতেন এবং হৃদয়ের রঙ মিশিয়ে প্রকাশ করতেন। তখন বাস্তব পরিবর্তিত হয়ে হতো রূপময়। আদি গোষ্ঠীর উৎসবটি শেষ হলে তারা এই রূপলোককে সম্পূর্ণ ভুলে যেতো না। এর ছন্দকে তারা ধরতো দেহমনে। কর্ম দ্বারা প্রকৃতি আয়ত্বে আসতো ফলনে, আর ছন্দে প্রকৃতি আয়ত্বে আসতো রূপলোকে। উৎসবে অংশগ্রহণকারী সবাই ছন্দের দোলায় রূপ সৃষ্টিতে সামিল হতো। তারা বিভোর হতো আশা ও মঙ্গলানুভূতিতে। সাথে মিশে থাকতো চেতনা। কল্পনা নিয়ে আসতো শিল্পীর মনোজগতের বাস্তব। আবার এভাবেও বলা যায় বাস্তব পরিবর্তিত হতো কল্পলোকে।
বাস্তব প্রকৃতিতে সম্ভাবনাময় বলে একটা বিষয় থাকে। শিল্পী সেটা দেখে মানুষের প্রয়োজনের নিরিখে। সে বাস্তব পরিবেশকে অনুকূলে নিয়ে আসে। বাস্তব পরিবেশ হচ্ছে সম্ভাবনার উপাদান সহ বাস্তব। এই সম্ভাবনাই রূপলোকের কাঠামো। শিল্পীর স্বপ্নকল্পনা এই বাস্তব সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। মূল বাস্তব থাকে কল্পলোকের গোড়ায়। এই সম্ভাবনা কর্মে প্রতিফলিত হয়ে আশা ও মঙ্গলের আকৃতি দেয়। এখানে শ্রমের প্রাধান্য থাকলেও রূপ দেয় গতি।
আদি শিল্পীদের মধ্যে একটি জাদু অনুভূতি বা মায়ালোক বিরাজ করতো। এই জাদু অনুভূতি তাদেরকে পুরোটা বোঝতে দিতো না প্রকৃতিকে। তারা মনে করতো জাদু দিয়ে প্রকৃতিকে ধরা সম্ভব। মনে করতো নাচ-গান-অভিনয়ের মায়ালোক দিয়ে শিকারের বস্তু মহিষ বা হরিণকে ধরা সম্ভব। মানুষ এই জাদুর ওপর আস্থা এনেছিলো কারণ তার ভাবাদর্শ তখন পর্যন্ত বাস্তবকে বোঝার মতো সমৃদ্ধ ছিলো না।এটাই দর্শন।
শ্রেণি বিভক্ত সমাজে এসে চেতনা যখন দানা বাঁধলো তখন সমাজ বিকশিত হলো। জগতের বিকাশের সাথে দর্শনেরও বিকাশ হলো। বোঝা গেলো মেহনত তৈরি করেছে মানুষের সব প্রয়োজনীয় উপাদান। কিন্তু একটা উল্টো ঘটনাও ঘটে গেলো। সমাজের চেতনাকে যারা দখল করেছিলো সেই শাসক-শোষকগোষ্ঠী অর্থাৎ সমাজের ক্ষুদ্র অংশটি বোঝাতে চাইলো চেতনাই প্রধান, সব কিছুর মূলে। তারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এমনটা বললো কারণ সামাজিক চেতনাকে তারা ইতোমধ্যে কুক্ষিগত করতে পেরেছে। আসলে সবকিছুতে চেতনার একটা ভূমিকা থাকলেও মেহনতই মূল। যেমন- কেউ একটা ঘর নির্মাণের চিন্তা করলো কিন্তু ঘরটি নির্মিত হবে না যতোক্ষণ এর সাথে সম্মিলিত মেহনত যুক্ত না হবে। তাই বর্তমান শ্রমিক শ্রেণি চেতনার প্রাধান্য বিষয়ক বক্তব্য মানলো না। তারা চেতনা ও মেহনতের সামঞ্জস্য করার প্রয়াস পেলো। এটা একটা আশার দিক। সাহিত্যিকের কল্পলোকে এর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। সাহিত্যিককে বাস্তব দৃষ্টিতেই জগৎকে দেখতে হবে। কারণ মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতি বাস্তব। এই বাস্তবের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া থেকেই চেতনার উদ্ভব।
আদি নাচ-গান-অভিনয়ের উপাদানগুলো ছিলো মানবীয়। মানবীয় সম্পদের বৃদ্ধির সাথে সাথে শিল্পের উপাদানগুলোও বৃদ্ধি পেলো। বেরিয়ে এলো সুন্দর ছন্দোবদ্ধ শব্দ-পদ-বিন্যাস। বিশেষজ্ঞদের মতটি এখানে উল্লেখযোগ্য, তারা বলেছেন- কবিতা হচ্ছে জীবিকার শব্দময় সৌন্দর্যের প্রকাশ। জীবিকা সামাজিক, কাজেই কবিতাও সামাজিক অর্থাৎ মানুষের কামনা-বাসনা সমাজ সম্পৃক্ত; কবিতায় তাই প্রতিফলিত। কবিতায় ফুটে ওঠে সমাজ-সম্পর্কের ছাপ যার বাহন আবেগময় শব্দ। এভাবে শিল্পকলার জগতে কবি ও কবিতা জায়গা করে নিলো। দেখা গেলো ভাষার বিকাশের সাথে সাথে গোষ্ঠীগুলোতে কবির সংখ্যা বৃদ্ধি পেলো বেশ। এটা হলো শিল্পীর অন্তর্লোকের প্রকাশের যন্ত্রণা থেকে।
প্রকাশের যন্ত্রণা যে গোষ্ঠীসমাজে ক্রিয়া করেছিলো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সাহিত্যে তা নিষ্ক্রিয় হলো না। আসলে এ দুটো পরস্পর সম্পর্কিত। কিন্তু সমাজ শ্রেণি শাসিতই রয়ে গেলো। মুক্ত সমাজ, শিল্পীর মুক্ত কল্পলোক যা মানবতার সাথে সম্পৃক্ত, শিল্পজগতের আজকের প্রত্যাশা।(চলবে)——-