ইতিহাস একটি প্রাকৃতিক বিষয়গত প্রক্রিয়া যার স্রষ্টা মানুষ।মানুষের ইচ্ছায় ইতিহাস নির্মিত হয় না, তৈরি হয় সমাজের প্রতিটা স্তরের বৈষয়িক অবস্থার দ্বারা। এই বৈষয়িক অবস্থাই নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের আত্মিক ও রাজনৈতিক জীবন। মানুষের অস্তিত্বই তার চেতনা ঠিক করে দেয়। সে জন্যই এতো গুরুত্বপূর্ণ বৈষয়িক উপাদান, মানুষের শ্রম, শ্রমের বস্তু, শ্রমের উপকরণ, উৎপাদনের উপকরণ, উৎপাদিকা শক্তি, উৎপাদন প্রণালি, উৎপাদন-সম্পর্ক বিষয়ে জানা, যা অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে।
প্রতিটা ঐতিহাসিক পর্যায়ে উৎপাদন-সম্পর্ক সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা গঠন করে, তৈরি করে অর্থনৈতিক ভিত্তি। সমাজের আপন অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া বৈষয়িক মূল্য উৎপাদন করা যায় না। উৎপাদন-সম্পর্ক আলোচনা করলে দেখা যায় অর্থনৈতিক ভিত্তিই ঠিক করে অন্যসব সামাজিক সম্পর্ককে। সব সামাজিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর গড়ে তোলে একটি উপরিকাঠামো, যার মধ্যে পড়ে সমস্ত রাজনীতি, আইনগত, দার্শনিক, নীতিবিদ্যাগত, ধর্মীয় ও অন্যান্য অভিমত এবং ভাব-ধারণা। এর অনুষঙ্গী হচ্ছে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, আইন, বিচার, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও আরো প্রতিষ্ঠানসমূহ। অর্থনীতি একটি সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে উৎপাদন-সম্পর্ককে পাঠ করে উৎপাদিকা শক্তি ও উপরিকাঠামোর সাথে তার জটিল মিথষ্ক্রিয়ায়।

উৎপাদন-ভোগ-বন্টন ও বিনিময় অবিচ্ছিন্ন। পুঁজিবাদী অর্থনীতি এটা স্বীকার করে না। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় মার্কস এর ওপর আলোচনা করেছেন, গবেষণা করেছেন। গবেষণার পদ্ধতিটি বিজ্ঞানসম্মত। প্রাকৃতিক নিয়মের মতো অর্থনীতিরও নিয়ম আছে। অর্থনৈতিক নিয়মগুলোর জ্ঞান উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্কের বিকাশ নিশ্চিত করে। প্রকৃতি ইচ্ছা-নিরেপেক্ষ এবং নির্দিষ্ট অবস্থায় প্রাকৃতিক নিয়মগুলো একই থাকে। অন্যদিকে সমাজের বিকাশ হয় মানুষের শ্রম দিয়ে। মানুষ তার নিজের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। অর্থনৈতিক নিয়মগুলো আকস্মিক নয়। মানুষ তার কর্ম দিয়ে জগৎ বদলিয়ে ইতিহাস তৈরি করে। মানুষের অর্থনৈতিক কাজের চালিকাশক্তি বোঝতে হলে অর্থনৈতিক নিয়মগুলোকে জানতে হবে। জানতে হবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। বুর্জোয়া অর্থনীতি থেকে মার্কসীয় অর্থনীতি পৃথক, সে তার দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। অর্থনৈতিক নিয়মগুলো প্রাকৃতিক নিয়মগুলোর মতোই মানুষের ইচ্ছা ও চেতনা নিরপেক্ষ।
অর্থনীতির ইতিহাস হচ্ছে ভাবাদর্শের সংগ্রাম। পুঁজিবাদ নিজেকে সবসময় চিরন্তন সমাজব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে। পুঁজিবাদের জীবনরসের উৎস হচ্ছে শোষণ, যার প্রেক্ষিতে সে তার অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো ব্যাখ্যা করে। অন্যপ্রান্তে মার্কসীয় অর্থনীতি হচ্ছে শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের সংগ্রামে মতাদর্শগত হাতিয়ার। এদিক থেকে মার্কসীয় অর্থনীতি একটি বিপ্লব, যার দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ।
এ পর্যন্ত পৃথিবীতে পাঁচটি সমাজব্যবস্থার আবির্ভাব হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি শোষণমূলক আর দুটি শোষণহীন। দাস সমাজ, সামন্ত সমাজ এবং পুঁজিবাদী সমাজ হচ্ছে শোষণমূলক সমাজ। আদিম সাম্যবাদী সমাজ একটি অসহায়, অনুন্নত শোষণহীন সমাজ। আর সমাজতন্ত্র হচ্ছে একটি শোষণহীন উন্নত সমাজ। মার্কসীয় অর্থনীতি এই সমাজগুলোর উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ করে। মার্কসীয় অর্থনীতি বলে, আজকে যা আছে একদিন তা ছিলো না এবং একদিন তা থাকবে না।
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সংঘটিত অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পৃথিবীর মানুষকে নতুন মানবিক অনেককিছু দিয়েছে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় সত্তর বছর পার না হতেই ভেঙ্গে গেলো এই স্বপ্ন-সৌধ। প্রশ্ন জাগে কেনো? নিশ্চয় এর অনেক গভীর সূক্ষ্ম কারণ আছে। এ কারণটি প্রায়োগিক, তত্ত্বগত। মার্কস সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের পথ ব্যাখ্যা করেননি, করলে সেটা ইউটোপীয় হতো। লেনিন পাঁচ বছর নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালিয়েছিলেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে; অনেক হোঁচট খেয়ে। তাঁর মৃত্যুর পর যাদের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পড়ে তারা হয়ে ওঠেন যান্ত্রিক এবং পতনের আগ পর্যন্ত এমনটাই থাকেন।
পৃথিবী থেকে শোষণ উঠে যায়নি বরঞ্চ আরো তীব্রতর হয়েছে। শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই একটি চলমান আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া, তাই অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে যুগোপযোগী একটি তত্ত্বের বিকাশ করতে হবে শোষণমুক্তির লড়াইয়ের মাঠ থেকে, সে দায়িত্ব পৃথিবীর সকল সাম্যবাদীদের। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমাদেরকে আজ অবশ্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে জানতে হবে অর্থশাস্ত্র যা বিশ্লেষণ করে।