পরীক্ষার রাতেও কবিতাটা লেখার চেষ্টা করেছে ফাহাদ ।এই মেধাবী যুবকটি কবিতটার স্পর্শ পেতে চায়, দীর্ঘ সময় ধরে চায় । ফাহাদ খুব শান্তশিষ্ট প্রকৃতির, মৃদুভাষী এবং স্পষ্টভাষী । তার ভেতরে একটা প্রচণ্ড ঝড় বইছে যা কেউ দেখে না, বোঝতে চায় না । আজো সে পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে এসেছে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে । কোন কিছু ভাল্লাগেনা তার । গাড়িতে ওঠেনি ইচ্ছে করে, হেঁটে রওয়ানা দেয় । বাসা আর হলের দূরত্ব অল্প । ফুটপাথটা খুব সুন্দর, সিটি কর্পোরেশন কংক্রিটের চৌকো সাজিয়ে করেছে । একাশিয়া, দেবদারু এবং নানা জাতের গাছের সারি বাম পাশে । আনমনে হাঁটতে থাকে ফাহাদ । হাঁটতে হাঁটতে সে একটা সিদ্ধান্ত নেয়, বাকি পরীক্ষাগুলো দেবে না । এই সিদ্ধান্ত সে ধপ করে নেয় না, তার মধ্যে বহুদিনে এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে । অব্যক্ত কষ্ট তাকে তাড়া করছে অনেকদিন থেকে । পরীক্ষার মতো সিরিয়াস ব্যাপার এখন তার একদম সহ্য হচ্ছে না ।
ফাহাদ যে পরীক্ষা ড্রপ দিচ্ছে, এ খবর বাবা জানবে না, জানার সুযোগ নেই, সময় নেই । অন্যদিকে বড় ভাই আবিদ একমাত্র ভাইটিকে নিয়ে স্বপ্নের পর স্বপ্ন বুনতে থাকবে । ফাহাদের পেছনে জোর জোগান, প্রাইভেট টিউটর, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ ইত্যাদি সব দেয়া হয়েছে । এছাড়া রয়েছে ঘরোয়া পরিবেশে বিনোদনের যাবতীয় ব্যবস্থা । রয়েছে বেতনভুক্ত সার্বক্ষণিক কেয়ারটেকার । সুতরাং তার কাছ থেকে বড় কিছু আশা করা অন্যায্য না ।
কবিতাটার দিকে একমাত্র ধ্যান ফাহাদের । এই কবিতায় সে নন্দিতার পদধ্বনি শুনতে পায় । কবিতাটার আকাশে নন্দিতা সারাক্ষণ ভেসে বেড়ায়, পার্কে জোছনার সাথে খেলা করে, বাগানে গোলাপের মতো ফুটে থাকে । ওকে ফাহাদের বলতে খুব ইচ্ছে করে, নন্দিতা তুমি আমাকে মুক্ত কর, আমি নিঃশঙ্ক নীড় থেকে বেরিয়ে ঝড়ো হাওয়ার আকাশে উড়তে চাই । ফাহাদ অবশ্য একদিন বাবাকে বলেছিলো, বাবা আমি নন্দিতাকে বিয়ে করতে চাই, হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক বলেছিলো সে । আবিদের বিয়ে হয়নি, এ কথাটা তার মাথায় ছিলো না এমনটি নয় । তার যুক্তি হচ্ছে, বিয়েটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার । কথাটা শোনে বাবা হয়তো একটু মজা পেয়েছিলেন । তিনি মাথা সামান্য হেলিয়ে চোখ ছোট করে হেসে বলেছিলেন, নন্দিতাটা কে খোকা ? একজন বিধবা । সে আমার সাথে পড়ে বাবা, তোমার স্টাফ চারুবালা দেবীর মেয়ে, বড় ভালো – উত্তরে বলেছিলো ফাহাদ । শোনে বাবা আবিদকে ডেকে বলেছিলেন, ফাহাদকে নিয়ে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবি, ভালো কোন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো আবশ্যক, ডাঃ ফয়সালকে দেখালে ভালো হয় ।
আবিদ পড়াশোনা করেছে বিদেশে । খুব স্মার্ট, বাবাকে সাহায্য করতে যা প্রয়োজন । বাবার মনটা যথাযথ বোঝে বলে তাঁর কাছে ওর খুব কদর । কারখানা, ব্যবসা, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদির দেখাশোনায় বাবাকে তার সাহায্য করতে হয় । আর্থিক বিষয়ের এমন কোন শাখা নেই যেখানে ওদের বিচরণ নেই । ওরা শুধু ফাহাদের কবিতার দেশে প্রবেশ করতে পারে না । আর কবিতাটাও ওদের সংস্পর্শে বিকট চিৎকার দিয়ে ওঠে যে জন্য ফাহাদের অন্তর বিষাদে ভরে ওঠে ।
এসব নানান বিষয় ভাবতে ভাবতেই ফাহাদ বাসায় আসে । এসেই শরীরটা এলিয়ে দেয় বিছানায় । কেয়ারটেকার করিম চাচা ওকে খাবার টেবিলে নিতে এসে দেখে ছেলেটা জুতোটাই খোলেনি, কাপড় পাল্টায়নি ঘুমিয়ে গেছে । করিম ভাবে ও হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কিন্তু তার মানসিক ক্লান্তির খবর রাখে না । আস্তে আস্তে ডাকে, উডেন ছোটসাব, খাইবেন না, অসুখ লাগতাছে কি আপনার ? ফাহাদ কোন সাড়া দেয় না । করিম উদ্বিগ্ন হয়, ফাহাদের মাথায় হাত বুলায়, পায়ের জুতোটা খোলে দেয় ।
ঘুমিয়ে ফাহাদ স্বপ্নে মাকে পেয়ে যায় । পরনে লালপেড়ে ধবধবে সাদা শাড়ি, মুখে জুঁই ফুলের সেই স্নিগ্ধ হাসিটি আর অর্ধেক মাথায় ঘোমটা । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ফাহাদ মাকে পেয়ে যেনো সেই ছোট্টটি হয়ে যায় । মা তাকে কোলে নেয়, বুকের মাঝে চেপে ধরে আদর করে চুমো খায় । মার সাথে ঘুরতে ঘুরতে ছাদে ওঠে এবং সেখানে গিয়েই তার ঘুম ভেঙ্গে যায় । যন্ত্রণা তাকে অক্টোপাশের মতো খামচে ধরে । অল্পক্ষণের মধ্যেই তার দুচোখ ভিজে ওঠে । করিম আসে, তার মাথায় হাত রাখে । বেসিনে নিয়ে হাত-মুখ ধোয়ায় । তারপর খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশন করে । ফাহাদ খেতে শুরু করে আর বার বার করিমের মুখের দিকে চায় ।পৃথিবীতে করিম তার সবচেয়ে পরিচিত মুখ । নন্দিতার মতো করিম চাচাকেও তার মনের কথা সব সময় খোলে বলে । করিমকে ফাহাদ বলে, চাচা সেই গল্পটা একবার বলবে ? কোন গল্পটা ছোটসাব, করিম জানতে চায় । ঐ যে রাক্ষসী পদ্মানদীর গল্প চাচা, ভয়াল এক ঝড়ের রাতে তোমার স্ত্রী-পুত্রকে চোখের পলকে ভাসিয়ে নিয়েছিলো । গঞ্জ থেকে ফিরে তুমি আর তাদের পাওনি । তারপর কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে তুমি এ বাড়িতে উঠেছিলে । মা মৃত্যুর সময় আমার ভার তোমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন ।তোমার ছেলেটাও নাকি দেখতে আমার মতোই ছিলো । এখনো এ বাড়িতে আছো সে শুধু টাকার জন্যে না । করিম চাচা এ গল্পটা তোমার মুখে সব সময় শুনতে খুব ইচ্ছে করে ।
ফাহাদের এমন সব কথা করিম চাচার ভেতরটা ভীষণ নাড়িয়ে দেয়, চোখ ভিজে ওঠে, কোন কথা বলতে পারে না । তারপর ওর খাওয়া শেষ হলে নিরবে চলে যায় ।
করিম চলে গেলে ফাহাদ আবার একা হয়ে পড়ে । সে অনুদিত আফ্রিকান কবিতায় ডুব দেয় । রক্তাক্ত এই কবিতাগুলো ঠিক তার ভেতর প্রদেশের মতো । এগুলোর সাথে সে অনেকক্ষণ কাটায় । মনটা আবার বিচ্ছিরি হয়ে যায় । গেম, মেডোনার গান, ইণ্ডিয়ান নাচ জমে না । লালন-হাছন ক্ষণিক আনন্দ দিলেও ফের বাড়িটাকে তার কাছে একটা ভুতোরে বাড়ি বলে মনে হয় ।
রাত দশটা । করিম চাচা অনেকবার ফাহাদের ঘরে উঁকি দিয়ে গেছে । আবিদভাই এখনো ফেরেনি । বাবাও না । অবশ্য এদের ফেরার নির্দিষ্ট কোন সময় নেই । ওরা সময় মেনটেইন করে যাবার বেলায় আর তা কাঁটায়-কাঁটায় । আবিদভাই মনে হয় এখন ক্লাবে আছে । ক্লাবটা হচ্ছে সঙ্গ এবং আনন্দ কেনার দোকান । সন্ধ্যের পরের সময়টা সে বেশির ভাগই ওখানে কাটায় । কিন্তু ফাহাদ ! শুধু পড়া আর কতো ভাল্লাগে ? করিম চাচা ফাহাদের টেবিলে নিরবে এসে এক গ্লাস গরম দুধ রেখে গেছে এবং দুধটা খেয়েছে কিনা সেটা সে বারবার তদন্ত করতে আসবে । স্বাস্থ্য বিষয়ক বক্তৃতা দেবে । নিদ্রা বিষয়ক উপদেশ খয়রাত করবে । বলবে সংক্ষেপে এবং মমতা মিশিয়ে ।
রাত বারটা । কলিং বেলের শব্দ শোনা গেলো । আবিদ ভাই হয়তো এসেছে । হ্যাঁ তাই । তার কণ্ঠ ভেসে এলো । এখন করিম চাচার সাথে আবিদ ভাইয়ের আলাপ হচ্ছে । সকালের নাস্তার ধরণ, সাদা বেড়ালটার স্বাস্থ্যের খবর, এলসেশিয়ানটার জন্যে ফ্রিজে মাংস মজুত আছে কিনা ইত্যাদি দরকারি তথ্য আবিদ ভাই করিম চাচার নিকট থেকে জেনে নিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছে । কথা শেষ হলে আবিদ ফাহাদের ঘরের পাশ দিয়ে নিজ কক্ষে গেলো ।
ঘুম আসছে না ফাহাদের । সে জানলা দিয়ে ঝলমলে শহর দেখে । চোখ ধাঁধিয়ে যায় । মনে হয় ফ্লাটগুলো আলোর দুল পরে মাটির মায়া ছেড়ে আকাশ ছুঁতে চাইছে । হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায় । অন্ধকার ! মাতৃগর্ভের মতো । ফাহাদের ভাবনাগুলো আঁধারেই সাঁতার কাটতে থাকে ।
রাত দুটু । মিনিট পাঁচেক হলো বিদ্যুৎ এসেছে । করিম চাচা বাদামি টুলে বসে ঢুলছে । নিচে দারোয়ান ঝিমুচ্ছে । বাবা এসেছেন । করিম চাচার মুভমেন্ট থেকে তা বোঝা গেলো । তিনি এলে বাড়িটা যেন নড়ে ওঠে । বাবার ভাগ্য ভালো বাড়ি এসে তিনি কবরের মতো অন্ধকারে পড়েননি । অন্ধকারকে তিনি ভীষণ ভয় পান, ঘুমুতে যান পাওয়ারফুল বাল্ব জালিয়ে । বাবা রাতে খাবেন না জানালেন, বিদেশি গেস্টদের নিয়ে ডিনার সেরে এসেছেন । তিনি টলতে টলতে ফাহাদের ঘরের পাশ দিয়ে চলে গেলেন, রাতের পোশাক পরে এখন ঘুমোতে যাবেন । অবশ্য করিম চাচা আরো পরে বিছানায় যাবে, তার এখনো কিছু কাম বাকি আছে যাকে বলে রাতের শেষ গোছগাছ । সে সবশেষে একবার ফাহাদের ঘরে আসবে এবং তাকে সজাগ পেলেই জেরা করবে । এই তো চাচা এসে পড়েছে । ফাহাদ ঘুমের ভান করে গুটিসুটি মেরে বিছানায় পড়ে আছে । ফলে কোন ঝামেলা হলো না, সে চাদরটা ফাহাদের গায় এঁটে দিয়ে নিরবে বিদেয় নিলো ।
সকাল গড়িয়ে কিছুটা বেলা হলে করিম চাচার হাতের আলতো ছোঁয়ায় ফাহাদের ঘুম ভাঙ্গলো । চাচার রেখা-রেখা মুখ আর পাকা মুছের ফাঁকে স্নিগ্ধ হাসি শোভা পাচ্ছে । হাসিটা বাগানের এককোণে ফোটে থাকা ফুলের মতো আলাদা করা যায় । ফাহাদ করিমকে জিজ্ঞেস করলো, চাচা, বাবা আর আবিদ ভাই কি চলে গেছে ? হ্যাঁ, কোন সমস্যা ছোটসাব – করিম বলে । না, আমি যে আর পরীক্ষা দিচ্ছি না সে কথাটা জানাতে চাইছিলাম – বললো ফাহাদ ।
কথাটা শোনে করিম চিন্তাযুক্ত হলো, তার কি কোন ত্রুটি হয়েছে ? সে বোঝাতে চেষ্টা করে, ছোটসাব আমি মাত্র আজাড় অইছি, আইসে দেহি আপনি ঘুমে আছেন । উডেন, গোসল সাইরা খাইবেন । এই বলে ঘাড় বাঁকিয়ে হাত কচলাতে থাকে করিম । সে এমন কৈফিয়তের সুরে বলে ফাহাদ আর বসে থাকতে পারে না খাবার টেবিলে হাজির হয় । করিম চাচা প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলে, ছোটসাব আপনেরে নিয়া বহুত খোয়াব দেহি, অনেক বড় খোয়াব । কী যে দেহি নিজেই বুঝি না, তয় দেহি । আপনে কইছেন পরীক্ষা দিবেন না, এ জন্যি আমার বুক ভাঙ্গে ক্যান ? পুড়া কপাল আমার । কথাগুলো একদমে বলে ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ মুছে সে । চাচার দুই বিন্দু অশ্রুর মধ্যে ফাহাদ গভীর এক সমুদ্র দেখতে পায় । থমকে ওঠে সে । আবেগ তাকে চেপে ধরে আর খেতে পারে না । মুহূর্তে মনটা অবুঝ হয়ে পড়ে, শিশুর মতো আচরণ করতে ইচ্ছে করে । ছোট বেলার মতো করিম চাচার কোলে চড়ে বিড়াল ছানার মতো আদর নিতে ইচ্ছে করে । হৃদয়ের শূন্য পেয়ালাটা ভরে নিতে চায় । ইচ্ছে করে ষাটোর্ধ্ব মুখটায় একটা চুমু এঁকে দিতে । ফাহাদ হঠাৎ করিম চাচাকে বুকে চেপে ধরে বলে, চাচা তুমি এতো সুন্দর কেনো ?
সময় কম, ফাহাদ পরীক্ষায় অংশ নিতে প্রস্তুত হয় । করিম চাচা কলমটা হাতে তুলে দিয়ে বলে, ছোটসাব পরীক্ষার দিনে মন খারাপ করতে মানা, হাসেন । ফাহাদ হাসি আর ধরে রাখতে পারে না । গাড়িতে চড়ে সে বিদেয় নেয় ।
বিষয়টা আগাগোড়া ভাবার কোন ইচ্ছে হয় না ফাহাদের । অন্য পরীক্ষাগুলোর মতোই সে একটা ভালো পরীক্ষা দিয়েছে । তার মনটা খুব ভালো হয়ে যায় । বাড়ি ফেরার পথে সে অনুধাবন করে মস্তিষ্কের তথ্যকেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত কবিতাটার লাইনগুলো আশ্রয় নিয়েছে । করিম চাচাকে মেইন গেইটে পেয়ে যায়, অনাবিল হাসছে সে যা ফাহাদের হৃদয়াকাশে এক নতুন সূর্যোদয়।