ইতিহাসখ্যাত দেশ ও দেশের বাহিরে আলোরমিছিল নিয়ে অসীম সাহসিকতার ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর সরকারি কলেজের আজ ৬২তম বর্ষপূর্তি, পা রাখছে ৬৩’তে। ১৯৬৪ সালের ১ আগস্ট কারুকার্য্যে সমৃদ্ধ, প্রাচীন নির্দশনপূর্ণ কৃষ্টপুরের জমিদারবাড়িতে ভূমিষ্ট হয় এ বিদ্যাপীঠ।
এই কলেজের ছাত্র সংসদের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস, অর্জন, বীরত্ব, সাহসিকতা, সংগ্রামে অকুতোভয়ের দৃষ্টান্ত। তারুণ্যের জয়ের উল্লাসে অসম সাহসী শিক্ষার্থীরা ৬৬’র ৬দফা, ৬৯’র গণঅভূত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। সারাদেশের ন্যায় এ কলেজের শিক্ষার্থীরা গণঅভ্যূত্থানের মিছিল বের করে। তৎকালীন পাকিস্তান পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান এ কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী নান্দাইলের আজিজুল হক হারুন। যার নাম অনুসারে শহীদ হারুণ পার্ক নামকরণ করা হয়।
৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন এ কলেজের শিক্ষার্থী মদনের আব্দুল আজিজ। কলেজ ক্যাম্পাসটি পাকহানাদারের অত্যাচার রুখতে প্রশিক্ষণ শিবির হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের অংশ নেন এ কলেজের ছাত্র ফজলুল হক ভিপি ফজলু, মজিবুর রহমান, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম মোহাম্মদ আজাদ, সিরাজুল ইসলাম, কাউরাটের আঃ কদ্দুছ সহ আর অনেকেই। ২০২৪’র গণঅভ্যূত্থানেও কলেজের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। গণতান্ত্রিক প্রত্যেকটি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে এ কলেজ ক্যাম্পাস থেকেই।
এ কলেজটিতে ১৯৬৬ সনে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করে। ১৯৭০সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত ও পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রী কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯১সনের ২৫ এপ্রিল কলেজ সরকারিকরণ করা হয়। কলেজটিতে বর্তমানে এইচএসসিতে ছাত্র ১হাজার ৯৫জন, ছাত্রী ১হাজার ১১২জন, স্নাতক (পাস) ছাত্র ৮৬০জন, ছাত্রী ১৪৯৮জন, অনার্স (সম্মান) ছাত্র ১হাজার ৬১১জন ও ছাত্রী ১ হাজার ২০১জনসহ ৭হাজার ৩৭৭জন ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত।
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম গভর্ণিং বডির সভাপতি ছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী। প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন মিজবাহ উদ্দিন আহমেদ। সরকারিকরণের পরে ১৯৯৩সনের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম অধ্যক্ষ হিসাবে যোগ দেন প্রফেসর ড. সাকিনা বেগম। এ পর্যন্ত ৩৫জন এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রেদওয়ানুর রহমানসহ ১৭জনেই ছিলেন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রেদওয়ানুর রহমান জানান, ঐতিহ্যবাহী কারুকার্য্যরে মূল ভবন বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ। কলেজটি শিক্ষক শূন্যতা রয়েছে। শিক্ষার্থী অনুযায়ী শিক্ষকের পদ নবসৃষ্ট প্রয়োজন। সম্পত্তি রক্ষা ও সবার নিরাপত্তা জন্য কলেজের খেলার মাঠ, হোস্টেল ও কলেজ ক্যাম্পাসের চারপাশে সীমান প্রাচীর প্রয়োজন। বর্ষা মৌসুমে অনেক স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, সেখানে মাটি ভরাট প্রয়োজন। পুকুরের পাড়ে গাইডল ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ সম্ভব হলে শিক্ষার্থী ও যারা সকালে হাঁটেন তাদের উপকারে আসবে, পাশাপাশি কলেজের সৌন্দর্য্য বেড়ে যাবে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য ছাত্রবাস নির্মাণ অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজন।
এ কলেজের ছাত্র সংসদ ছিলো নেতৃত্বের বিকাশ, যোগ্য নেতা তৈরির কারখানা আর ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ের প্লাটফরম। শুধু কলেজের নয়, গৌরীপুরের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায়ও ভূমিকা রেখে আসছিলো এই ছাত্র সংসদ। যার নির্বাচন ২৬বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কলেজ ছাত্র সংসদের প্রথম নির্বাচনে কটিয়াদীর চাঁদপুরের উকিলবাড়ীর কামরুল ইসলাম ভিপি ও রামগোপালপুরের সাহেদ আলী ফকির জিএস নির্বাচিত হয়। ২য় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি ছিলেন রামগোপালপুরের নাট্যকার আব্দুল হাই, জিএস ফজলুল হক, ৩য় ছাত্রসংসদে ভিপি ভাংনামারীর আব্দুল মোতালেব, জিএস কাজী আশ্রাব আলী আর ৪র্থ ভিপি ছিলেন ফজলুল হক ও জিএস ইকবাল হাসান। গৌরীপুর রাজনৈতিক অঙ্গনে কলেজ সংসদের নির্বাচিত ভিপি, জিএস নানা পদে অধিষ্ঠ। সাবেক ভিপি ফজলুল হক, কাজিম উদ্দিন, আব্দুস সাত্তার, ইউনুস আলী, দেওয়ান কাঞ্চন খান, আব্দুল আউয়াল, আবুল কালাম, বেগ ফারুক আহাম্মেদ, শামছুল হক (দুইবার), মাহফুজউল্লাহ, ফারুক আহাম্মেদ, মাহবুবুর রহমান শাহীন ও সর্বশেষ নির্বাচিত সাবেক ভিপি শহিদুল ইসলাম অন্তর ও মাজহারুল ইসলাম টুটুল জিএস ছিলেন। নির্বাচিত ভিপি ও জিএস আওয়ামী লীগ-বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং জনপ্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজ ছাত্র সংসদের ২০০০-০১ শিক্ষাবর্ষে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি শহিদুল ইসলাম অন্তর ও জিএস মাজহারুল ইসলাম টুটুল। এরপরে একাধিকবার নির্বাচনের জন্য আন্দোলন হলেও হয়নি নির্বাচন। একবার নির্বাচনের জন্য তফসিলও ঘোষণা করা হলেও তা আলোরমুখ দেখেনি।