ঐতিহ্যের ধারক, শ্লৈপিক কারুকার্য্যে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ধ্বংসস্তপে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষার আলোকবর্তিকার সুতিকাগার ময়মনসিংহের গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০জুলাই ১১৫তম বর্ষপূর্তি। অনন্ত সাগরের পাড়ে সাড়িবদ্ধ নারিকেল গাছের প্রকৃতির অপরূপ সাজেসজ্জিত হয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯১১ সনের এই দিনে যাত্রা শুরু করে।
ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭১’র মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রয়েছে গৌররোজ্জ্বল অবদান। মেধাবী শিক্ষার্থীরাও ছড়িয়ে আছেন এবং ছিলেন উপমহাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। চোখ জোড়ানো নয়নাভিরাম সুনিপূর্ণ কারুকার্যে নির্মিত শতবর্ষী ইংরেজী ই অক্ষরের ভবনটি অনন্যাস্থাপত্য শৈলী।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় এ বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প। শিক্ষা কার্যক্রম চলে নতুন ভবনে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার ছিলো নিষিদ্ধ। এরেই মধ্যে সিংহভাগ ভবনে পরগাছা বটগাছ জন্মেছে। ৬ষ্ট শ্রেণির ক্লাসরুমের ফ্লোরে জন্মনেয়া বটগাছের শিকড় দেয়ালভেদ করে ছাদে উঠে বিশাল আকৃতির ধারণ করেছে। নষ্ট হচ্ছে অন্যান্য ভবন। কয়েকটি শ্রেণিকক্ষের দরজা-জানালাও এখন ভেঙে গেছে। নেই সীমানা প্রাচীর। জানালা লোহা-গ্রিলও চুরি হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুল আজিজ বলেন, ঐতিহ্যবাহী ভবনটি সংরক্ষণে প্রত্নতান্ত্রিক বিভাগের পদক্ষে অতীব জরুরী।
তৎকালীন জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর পিতা রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামে ১৯১১সনের ১০জুলাই ৬হাজার ১৮বর্গফুট আয়তনে এ বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। বিখ্যাত আর্কিটেক ও চীনা কারিগর দিয়ে নির্মিত এ ভবনটি দেখতে অনেকটা ইংরেজী (ই) অক্ষরের মতো। কাঠের ফ্রেমের উপর ইট, চুন-সুরকীর মিশ্রণে ১৫ইঞ্চির গাঁথানি দিয়ে নির্মিত লাল রং করা বিদ্যালয়টিতে সর্বমোট ১৩টি কক্ষ রয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অবৈতনিক প্রধান শিক্ষক বাবু জ্ঞানেন্দ্র নাথ মূখার্জি।
১৯১৯সনে সর্বভারতীয় সরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতি ছাত্র মোঃ আকবর আলী তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক আইন পরিষদের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন। প্রাদেশিক সরকারের অর্থ মন্ত্রী ফখরউদ্দিন আহমেদ, তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের কৃষি মন্ত্রী পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র মন্ত্রী হাসিম উদ্দিন আহমেদ, প্রাদেশিক পরিষদের এম.পি.এ আব্দুল হামিদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ. এফ. এম. আহসান উদ্দিন চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোঃ হাতেম আলী এম.সি.এ, বিশিষ্ট নাট্যকার ও সাহিত্যিক আশকার ইবনে শাইখ অত্র বিদ্যালয়ে জ্ঞানর্জন করেন। নেত্রকোনা থেকে ইংরেজ হঠাও আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা মুখ্যলাল দাসও এবিদ্যালয়ের ছাত্র। বর্তমান সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের শিক্ষা বিভাগের বাংলাদেশ প্রধান সুব্রত শংকর ধর, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এ.কে.এম.এ.মুক্তাদির, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রজেক্ট ডিরেক্টর ডা: মো: শাহাবুদ্দিন, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাহ আলমগীর, বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের প্রধান ড. আমির হোসেনও এই বিদ্যালয়ের এক সময়ের কৃতি ছাত্র ছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃস্থানীয় খালেদুজ্জামান, ডা: আব্দুস সোবহান, তফাজ্জল হোসেন চুন্নু, রফিকুল ইসলাম, ফজলুল হক, মো: আবুল হাসিম চেয়ারম্যান, আব্দুল হাকিম, মো: ইদ্রিস আলী, মো: বোরহান তালুকদার, আশুতোষ রায়, আ: হান্নান, আবুল খায়ের, মো: সিরাজ বক্স, কনু মিয়া, জসিম উদ্দিনসহ অনেকেই এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৯’র গণঅভ্যত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত আজিজুল হক হারুণের মিছিলেও ছিল আরকে উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। গৌরীপুর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কর্মরত ৩৪ জনের মধ্যে ২৬জন প্রতিনিধিই এই বিদ্যালয়ের ছাত্র।
জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর পিতা-রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামের রাজেন্দ্র-এর ইংরেজী আদ্যক্ষর ‘আর’ ও কিশোর- এর আদ্যক্ষর ‘কে’ এর সমন্বয়ে বিদ্যালয়টি আর, কে, উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিতি লাভ করে। জনশ্রুত আছে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর এস্টেট ম্যানেজার বাণী কন্ঠ নিয়োগী এবং দেওয়ান নলিনী রায়-এর পরামর্শ নিয়েছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রাজা ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন রাজা রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর দত্তক পুত্র। শিক্ষা ও সঙ্গীতানুরাগী জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর প্রজা সাধারণের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে অত্র বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা ঈশ্বরগঞ্জে তাঁর স্ত্রী রাণী বিশেশ্বরী দেবীর নামে বিশেশ্বরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে আরও একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।