আজ শনিবার ৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম:
তারাকান্দা সাব-রেজিস্ট্রারের আয়োজনে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান ও মানবতার অস্তগামী সূর্য পৃথিবীর বিবেকবান মানুষের প্রতি এক উদাত্ত আহ্বান প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে হবে : প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে ‘নিরবিচ্ছিন্ন সময় সাশ্রয়ী’ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে আগুন গৌরীপুরে স্বজনের বর্ষাবরণ উৎসব গৌরীপুর মহিলা কলেজ পরিদর্শনে মুগ্ধ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দুঃস্বপ্ন ও ভয় থেকে বাঁচতে নবীজির শেখানো দোয়া তিন ফিফটিতে তিনশ ছুঁইছুঁই সংগ্রহ বাংলাদেশের অনুমোদনহীন কারখানায় প্লাস্টিক পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে ডিজেল
নিজস্ব প্রতিবেদক || দৈনিক বাহাদুর
  • প্রকাশিত সময় : জুন, ৭, ২০২৬, ১:১৮ অপরাহ্ণ




ধর্ষণ প্রমাণে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ধর্ষণ নিয়ে ইসলামী আইন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো ‘ধর্ষণ প্রমাণ করতে কি চারজন সাক্ষী লাগবে?’

অনেকের ধারণা, চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছাড়া ইসলামে ধর্ষণের বিচার সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সাক্ষী না থাকলে অপরাধী কখনো শাস্তি পাবে না।

বাস্তবে ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিস্তৃত আলোচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিষয়টি এত সরল নয়। বরং কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের বিচারিক দৃষ্টান্ত এবং চার মাজহাবের ফকিহদের মতামত বিশ্লেষণ করলে একটি গভীর ও বাস্তবধর্মী বিচারব্যবস্থার চিত্র ফুটে ওঠে।

প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় বুঝতে হবে ইসলামী আইনশাস্ত্রে ব্যভিচার (জিনা) এবং ধর্ষণ (ইকরাহ বা জোরপূর্বক যৌন সহিংসতা) এক বিষয় নয়।

জিনা হলো উভয় পক্ষের সম্মতিতে সংঘটিত অবৈধ যৌন সম্পর্ক, আর ধর্ষণ হলো এক পক্ষের ওপর জোরপূর্বক সহিংসতা। ফলে উভয়ের প্রমাণের পদ্ধতিও এক নয়।

কুরআনে চারজন সাক্ষীর কথা এসেছে ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করো।’ (সুরা আন-নিসা ১৫)

আবার সুরা আন-নূরে মিথ্যা ব্যভিচারের অভিযোগকারীদের জন্য চারজন সাক্ষী আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু অধিকাংশ ফকিহ স্পষ্ট করেছেন, এই বিধান মূলত স্বেচ্ছায় সংঘটিত ব্যভিচারের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ধর্ষণ একটি সহিংস অপরাধ, তাই এর বিচার কেবল চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর ওপর নির্ভরশীল নয়।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে যদি কোনো সাক্ষী না থাকে, তাহলে কী হবে?

বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনাই নির্জন স্থানে ঘটে, যেখানে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকে না। ইসলাম এমন অবাস্তব শর্ত আরোপ করেনি যে চারজন লোক ঘটনাটি দেখে না থাকলে বিচারই হবে না। বরং ইসলামী বিচারব্যবস্থার অন্যতম নীতি হলো ‘সত্য উদঘাটন ও মজলুমকে ন্যায়বিচার প্রদান।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর যুগে একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এক নারী অভিযোগ করেন যে একজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক নির্যাতন করেছে। তদন্তের পর প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ভুক্তভোগী নারীর ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করেননি এবং অপরাধীকে দণ্ড দেন। (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি)

এই ঘটনা থেকে ফকিহরা বুঝেছেন যে ধর্ষণের বিচার কেবল চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না।

দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগেও এমন কিছু বিচারিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যেখানে পরিস্থিতিগত আলামত ও বাস্তব প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী বিচারব্যবস্থায় একে বলা হয় ‘কারিনা’ (Circumstantial Evidence) বা পরিস্থিতিগত প্রমাণ।

ধরুন, একজন নারী অভিযোগ করলেন যে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, বিচারক কী কী বিষয় বিবেচনা করবেন?

প্রথমত, ভুক্তভোগীর বক্তব্য। দ্বিতীয়ত, তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে কি না। তৃতীয়ত, ঘটনাস্থলের আলামত। চতুর্থত, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষ্য। পঞ্চমত, অভিযুক্তের বক্তব্য ও আচরণ। ষষ্ঠত, চিকিৎসা ও ফরেনসিক রিপোর্ট।

সপ্তমত, আধুনিক যুগে ডিএনএ পরীক্ষা, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং এবং ডিজিটাল প্রমাণ।

প্রখ্যাত ইসলামী আইনবিদ ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তার ‘আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারক এমন সব প্রমাণ গ্রহণ করতে পারেন, যা সত্য উদঘাটনে সহায়ক হয়।

তার ভাষায়, শরিয়তের উদ্দেশ্য হলো সত্য প্রতিষ্ঠা, কোনো অপরাধীকে প্রমাণের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার আড়ালে রক্ষা করা নয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে যদি দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের সম্মতিতে অবৈধ সম্পর্ক করে, পরে একজন দাবি করে যে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তাহলে বিচারক কীভাবে সত্য নির্ধারণ করবেন?

ইসলামী বিচারব্যবস্থা কখনো কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে না। যেমন একজন নারী অভিযোগ করলেই অভিযুক্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হয়ে যায় না, তেমনি অভিযোগ অস্বীকার করলেই সে নির্দোষ হয়ে যায় না। বিচারকের দায়িত্ব হলো সব তথ্য, আলামত, সাক্ষ্য ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা।

ইসলামী আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো ‘আল-বাইয়্যিনাতু আলা আল-মুদ্দাঈ’ অর্থাৎ, ‘যে দাবি করবে, প্রমাণের দায়িত্ব তার ওপর।’

অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রাখে।

এই কারণে ইসলামী বিচারব্যবস্থায় তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচারক কেবল একটি বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত দেন না, বরং তিনি সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন।

ইমাম মালিক রহ. এর মতে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর বক্তব্য, শারীরিক আলামত এবং পরিস্থিতিগত প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালেকি ফিকহে এমনকি গর্ভধারণ, আঘাতের চিহ্ন বা অন্যান্য শক্তিশালী আলামতও বিচারিক বিবেচনার অংশ হতে পারে।

ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং হানাফি ফকিহগণও বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ ও আলামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর অনুসারীরাও ধর্ষণকে একটি সহিংস অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যেখানে বিচারক কেবল চার সাক্ষীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নন।

আধুনিক যুগে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সমসাময়িক আলেম, ফিকহ একাডেমি এবং ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন যে ডিএনএ পরীক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। যদিও এটি সব ক্ষেত্রে এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তবে অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে এটি বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সৌদি আরব, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের আদালত আধুনিক ফরেনসিক প্রমাণকে বিচারিক সহায়ক উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।

ইসলামী বিচারব্যবস্থার মূল দর্শন হলো একদিকে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি অন্যায়ভাবে শাস্তি না পায়, অন্যদিকে যেন কোনো অপরাধী প্রমাণের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে না যায়। এই ভারসাম্য রক্ষার জন্যই ইসলাম তদন্ত, সাক্ষ্য, আলামত, স্বীকারোক্তি এবং পরিস্থিতিগত প্রমাণকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ধর্ষণের মতো অপরাধে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। ভুক্তভোগীকে অভিযুক্ত নয়, বরং নির্যাতিত হিসেবে দেখা হবে। তার মর্যাদা রক্ষা করা হবে। অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধী কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে। আর মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীও আইনের আওতায় আসবে।

সুতরাং ‘চারজন সাক্ষী না থাকলে ধর্ষণের বিচার হয় না’ এ কথা ইসলামী আইনশাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। বরং কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের বিচারিক দৃষ্টান্ত এবং চার মাযহাবের ফিকহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামের লক্ষ্য হলো সত্য উদঘাটন, নির্যাতিতের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সম্মান কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি আল্লাহপ্রদত্ত একটি পবিত্র আমানত। আর সেই আমানতের ওপর আঘাত মানে শুধু একজন মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধেই এক নির্মম অপরাধ।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর




Comments are closed.

     এই বিভাগের আরও খবর




অনলাইন জরিপ

জাতিসংঘের বিশেষ দূত এলিস ক্রুজ বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সব মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?

View Results

Loading ... Loading ...

পুরনো সংখ্যার নিউজ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০