মা উচ্চ বিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম করেননি তবে ৬ সন্তানেই সরকারি চাকুরজীবী গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি : রেজিয়া খাতুন। সত্তোর ছুঁইছুঁই করছে। উচ্চ বিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেন নাই। তার আগেই ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নের আব্দুল হাকিম ফকিরের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। তিনি ছয় সন্তানের জননী। জীবনের যাত্রা যখন শুরু ঠিক সেই সময়ে স্বামীকে হারান রেজিয়া খাতুন। নিজে না পারলেও কঠিন জীবন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে চার কন্যা আর দুই পুত্রকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেন। একজন বিসিএস কর্মকর্তাসহ ৬জনেই সরকারি কর্মকর্তা। স্বামীর কৃষি আর অকৃষি জমির পরিমাণ মাত্র ৪৮শতাংশ। দরিদ্র শ্রেণির কৃষক ছিলেন আব্দুল হাকিম ফকির। আর্থিক অবস্থাও সংকটাপন্ন। ঠিক সেই সময়ে রেজিয়ার আঁচলতলে সন্তানদের রেখে চিরবিদায় নেন তিনি। সঙ্গী হারা হলেও পথহারা হননি কখনও। দু’হাতে কঠোর পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা আর সাহসিকতার সঙ্গে হাল ধরেছেন এ সংসারের। অন্ধকারকে দূরীভূত করতেই কেরোসিনের আলোয় তৈরি করেন এক আলোর ভুবন। যা আজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রম-মেধা আর সাহসিকতায় নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসাবে স্থাপন করেছেন পুরো এলাকাজুড়ে। এই ভুবনে বেড়ে উঠা বড় ছেলে মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন ফকির। পিভিএমএস (বার) সহকারী পরিচালক বিসিএস (আনসার) সদরদপ্তর, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহনীতে কর্মরত আছেন। নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পাড়া দূর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন মেয়ে শাহনাজ পারভীন। ছোট ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহান ফকির ঈশ^রগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত। দ্বিতীয় কন্যা মনিরা পারুল উপজেলার রাইশিমুল দাখিল মাদরাসায়, তৃতীয় কন্যা সোনিয়া শান্তনা সিংরাউন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আর চর্তুথ কন্যা তানিয়া লিপি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর গৌরীপুর উপজেলার প্রশিক্ষক পদে কর্মরত আছেন। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে গৌরীপুর উপজেলায় ২০২৩সনে জয়িতা পুরস্কার পান তিনি। গতবছরের ৯ ডিসেম্বর জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় তাঁকে সংবর্ধিত করা হয়। এছাড়াও গতবছর সংবর্ধিত জয়িতা পদকপ্রাপ্তরা হলেন সমাজ উন্নয়নের জন্য মোছা. ফেরদৌসী নাসরিন, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনের জন্য মোছা. শিউলী চৌধুরী, শিক্ষা ও চাকুরীর জন্য সুমি আক্তার, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরুকারী মোছা. রোজিনা চৌধুরী মিতু। পৃথিবীতে ‘মা’ শব্দটির চেয়ে আপন আর কোনো শব্দ নেই। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯০৭ সালের ১২ মে প্রথমবার আমেরিকার ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটন শহরে ‘মাদার্স ডে’ বা মা দিবস পালিত হয়। ভার্জিনিয়ায় অ্যান নামে এক শান্তিবাদী সমাজকর্মী ছিলেন। তিনি কাজ করতেন নারী অধিকার নিয়ে। ‘মাদারস ডে ওয়ার্ক ক্লাব’ নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। ছোট ছোট ওয়ার্ক ক্লাব বানিয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নিতে চেষ্টা করতেন তিনি। অ্যানের একটি কন্যাসন্তান ছিল, যার নাম আনা মারিয়া রিভস জার্ভিস। একদিন ছোট্ট মেয়ের সামনেই অ্যান হাত জোড় করে বলেছিলেন, ‘আমি প্রার্থনা করি, একদিন কেউ না কেউ, মায়েদের জন্য একটা দিন উৎসর্গ করুক। কারণ তারা প্রতিদিন মনুষ্যত্বের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে চলেছেন। এটি তাদের অধিকার।’ মায়ের সেই প্রার্থনা হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যায় আনার। পরে অ্যানের মৃত্যুর দিনটিকে সারা বিশ্বের প্রতিটি মায়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন আনা মারিয়া। এরপর থেকে মায়েদের প্রতি সম্মান জানাতে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে মা দিবস। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে ‘মা দিবস’ ঘোষণা করেন। এর পর থেকে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস হিসাবে উদযাপন করে বিশে^র অধিকাংশ দেশ।