দগ্ধ যন্ত্রণায় এখনো ছটফট করেন রিকশা চালক মতিউর রহমান মতি। ২০১৭সনের বিজয় দিবসে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে শাহগঞ্জ বাজারে পেট্টোল বোমায় দগ্ধ হন তিনি। এখনো বিছানার বালিশের নিচে ছুরি নিয়ে ঘুমাতে হয় তাকে। দগ্ধ পায়ে চুলকালীর যন্ত্রণা থেকে অবসান পেতে ছুরি দিয়ে প্রতিরাতেই চুলকাতে হয় ক্ষতস্থানে। অর্থাভাবে সুচিকিৎসা হয়নি ৬বছরেও। বিজয় মাসের নাম শোনলে এখনো চমকে উঠেন তিনি।
রোববার (১৭ ডিসেম্বর/২০২৩) অচিন্তপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামের মৃত আব্দুর রাশিদের পুত্র ভ্যান চালক পেট্টোল বোমায় দগ্ধ মোঃ মতিউর রহমান ওরফে মতি মিয়া (৩৩) জানান, কারা পেট্টোল বোমা মেরেছিলো, সেটা জানি না! আমার শরীর পুড়ে গিয়েছিল, সেটা জানি; দগ্ধ শরীর নিয়ে এখনো আমি বেঁচে থাকার জন্য আর্তনাদ করি। চুলকানি আর দগ্ধস্থানে কালো কালো যে চামড়া জমাটবাঁধা হচ্ছে-এর যন্ত্রণার চেয়ে মৃত্যুও ভালো। আমার চিৎকারে শুধু আমার বাড়ির মানুষ নয়; আশপাশের প্রতিবেশীরাও ঘুমাতে পারেন না।
তিনি আরো জানান, পোড়া স্থানে জমাটবাঁধা কালো চামড়াটা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপারেশন করেছি। শীতের রাতে পা লেপের নিচে নেয়া যায় না। গরম হয়ে গেলেই চুলকানি বেড়ে যায়। শরীরে শীতের কাপড় না রাখতে পারায় গলায় টনসিলের সমস্যা হয়। টনসিলও অপারেশন করা হয়েছে।
ছেলের আর্তনাদে মা নীল বানু’র কাটছে নির্ঘুম রাত। তিনি এ প্রতিনিধিকে বলেন, ছেলের সুচিকিৎসা হয়নি। নিজের সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করেও ওর যন্ত্রণা থেকে অবসান দিতে পারি নাই। ছেলের এ যন্ত্রণা দেখে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন ওর বাবা আব্দুর রাশিদ। তিনি দিনরাত প্রার্থনা করছেন যেন তার ছেলেকে যারা পুড়িয়েছে তাদের যেন বিচার হয়। তিনিও মারা গেছেন। ছেলের যন্ত্রণারও অবসান হয়নি-বিচারও দেখে যেতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, এ বিচার এখন উপরওয়ালার (আল্লাহ) নিকট সপে দিয়েছি, তিনিই বিচার করবেন।
একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে রাজনৈতিক অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে পেট্টোল বোমা হামলার শিকার হন এ মতিউর রহমান মতি। তার সংসারের জীবিকার একমাত্র বাহন ‘অটোরিক্সা’ও পুড়ে যায়। তার স্ত্রী মোছা. নারগিস আক্তারের নামে ৫০হাজার টাকা এনজিও ঋণ নিয়ে মতি মিয়া এ রিকশা কিনে ছিলেন। এ ঘটনায় অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম অন্তর (প্রয়াত) বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। ২০১৭সনের ১৭ডিসেম্বর ১৬নং মামলায় ১১জনকে আসামী করা হয়। বাদী উল্লেখ করেন এ আসামীদের নেতৃত্বদানকারী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান শুভ্র’র সঙ্গে রাজনৈতিক ও বিভিন্ন বিরোধের কারণে অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদে মামলা, ভাংচুর ও পেট্টোলবোমা হামলা ঘটনা ঘটে। এ প্রসঙ্গে অচিন্তপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান টিটু বলেন, যারা পেট্টোল বোমা মেরে মানুষকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে তারা বঙ্গবন্ধু’র আদর্শের ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্মার্ট বাংলাদেশ বির্নিমানে চলা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মী হতে পারে না। প্রকৃত আসামীদের আড়াল করা হয়েছে। যা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক।
পুলিশ সূত্র জানায়, এ মামলাটি তদন্ত শেষে আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। দগ্ধ মতিউর রহমান জানান, শোনেছি ওই মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। অথচ আমার নিকট থেকে কোনো অভিযোগ নেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, বিজয় মাসের নাম শোনলে ভয়ে কলিজাটা শুকিয়ে যায়। ওই ইউনিয়ন পরিষদের সামনে গেলে আতঙ্কে উঠি। রিকশার পেসেঞ্জার জন্য ওই পরিষদের সামনের স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাই ভয়ে রিকশা চালানো ছেড়ে দিয়েছি, এখন ভ্যান গাড়ি চালাই।
অপরদিকে ২০১৭সনের ৩০ নভেম্বর ইউএনও’র বাসভবনসহ সিরিজ পেট্টোল বোমা হামলার ঘটনাটির চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে তদন্তকারী সংস্থা। ওইদিন ইউএনও’র বাসভবন ও শহরের সিনেমা হল মোড়, স্টেশন রোড মোড়, কালীপুর মধ্যম তরফ, বালুয়াপাড়া মোড়ের বাজারে একযোগে সকাল ৯টায় সিরিজ পেট্টোল বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল।
জানা যায়, ইউএনও’র বাসভবনে বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী মো. রফিকুল ইসলাম বাদি হয়ে (২০১৭সনের ৩০ নভেম্বর) ওইদিনেই বিস্ফোরণ আইনে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ সেসময় ৪জনকে গ্রেফতার করেন। তবে মামলাটি তিন দফা তদন্ত শেষে ২০১৯ সনের ২৫জুন চুড়ান্ত (ফাইনাল) রিপোর্ট বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইকতিয়ার উদ্দিন। এ প্রসঙ্গে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোফাজ্জল হোসেন খান বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে ৭১’র আর ৭৫’রের প্রেতাত্মারা জড়িত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ ঘটনা জড়িতদের খোঁজে বের করতে না পারাটা অত্যন্ত দুঃখজনক।