ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও গৌরীপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মাসুদুর রহমান শুভ্র হত্যা মামলার আসামী গৌরীপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ রফিকুল ইসলাম ও ইউপি চেয়ারম্যান রিয়াদুজ্জামান রিয়াদসহ ১৯জনকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
আলোচিত মাসুদুর রহমান শুভ্র হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক শেষ শুনানীর দিনে বৃহস্পতিবার (৬অক্টোবর/২০২২) বিচারক মনির কামাল এ আদেশ দেন। তিনি এ মামলার রায় ১০ অক্টোবর ধার্য্য করেছেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে এ মামলার যুক্তিতর্ক শুনানী শুরু হয়েছিল। ২০২০সনের ১৭ অক্টোবর গৌরীপুর পৌর শহরের পানমহালে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বিচার চেয়ে শুভ্র’র ছোট ভাই আবিদুর রহমান প্রান্ত বাদী হয়ে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।
বৃহস্পতিবার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের তিন নম্বর আদালতে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানী শেষে বিজ্ঞ বিচারক মনির কামাল আসামীদের জামিন না মঞ্জুর করে তাদেরকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ওই আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মাহবুবুর রহমান।
তিনি জানান, বিজ্ঞ বিচারক এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য ১০ অক্টোবর নির্ধারণ করেছেন। আসামীরা হলেন গৌরীপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির একাংশের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ১নং মইলাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াদুজ্জামান রিয়াদ (৩৯), তার ভাই মাসুদ পারভেজ কার্জন (২৭), উত্তরবাজার পশ্চিম লাইনের জুলমান রেজা অলির পুত্র সাকিব আহম্মেদ রেজা (২৮), পশ্চিম লামাপাড়ার আব্দুল হেলিমের পুত্র মোজাম্মেল হক (৩০), পশ্চিম কাউরাটের মৃত লাল মিয়ার পুত্র খাইরুল ইসলাম (৩০), পশ্চিম ভালুকার মৃত মাহবুর রহমান মাস্টার কাদেরের পুত্র রিফাত (২৫), পশ্চিম কাউরাটের মো. মোস্তফার পুত্র মো. হানিফ ওরফে আবু হানিফা (৩০), ইউনুছ আলীর পুত্র জাহাঙ্গীর আলম (২৮), মৃত আব্দুল খালেকের পুত্র মজিবুর রহমান (৩০), আইনুল হকের পুত্র শরীয়তউল্লাহ সুমন (৩৩), পৌর মেয়র সৈয়দ রফিকুল ইসলামের ভাই সৈয়দ তৌফিকুল ইসলাম (৪৮), অপর ভাই সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম জুয়েল (৩৮), পশ্চিম কাউরাটের চান মিয়ার পুত্র রাসেল মিয়া (৩২), কাউরাট মধ্যপাড়ার মৃত ঈমান আলীর পুত্র কামাল মিয়া (৩৫), আব্দুল হেলিমের পুত্র মো. মাঈন উদ্দিন (২০), পশ্চিম লামাপাড়ার মৃত নজরুল ইসলামের পুত্র শরীফুল ইসলাম নাঈম (২২), পশ্চিমকাউরাটের মৃত আব্দুল জব্বারের পুত্র রুহুল আমিন (২৮) ও পৌর শহরের রিস্কাপট্টি কচিকাচার মৃত আছির উদ্দিনের পুত্র শাহজাহান মিয়া (২৫), ছাত্রদল কর্মী শরীয়ত উল্লাহ সুমন (২৫) ও খাইরুল ইসলাম (২৭)।
তিনি আরো জানান, গৌরীপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, মইলাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াদুজ্জামান রিয়াদসহ ১৯ জনের বিচারিক কার্যক্রম ঢাকার দুই নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে শেষ হয়েছে। মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষে ইতোমধ্যে আমরা ১৭জনের সাক্ষ্য দিয়েছি। এ মামলায় আসামীপক্ষের ৮ জনের সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। আমরা আশা করি ন্যায় বিচার পাবো।
মামলা প্রসঙ্গে গৌরীপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার (৬ অক্টোবর/২০২২) সকাল ৯টা ১৪মিনিটে ফেসবুকে লিখেছেন ‘প্রিয় গৌরীপুরবাসী আপনারা আমার অক্সিজেনের মতো। ষড়যন্ত্রকরে আমাকে আপনাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্যই এ মিথ্যা মামলায় আমাকে হয়রানি করা হলো । আপনারা সব কিছুই জানেন আমাকে ও আমার পরিবারকে এ হত্যাকাণ্ড কেন্দ্র করে আমার বাসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাড়ি থেকে শুরু করে আমাকে হত্যা করতেও চেয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা! আপনাদের ভালোবাসা নিয়ে শেষদিন মিথ্যা মামলায় কোর্টে উঠছি। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে বেশি দিন আটকে রাখা যায় না। খুব শীঘ্রই ফিরে আসব, ইনশাল্লাহ।
মেয়র সৈয়দ রফিকের মন্তব্য হুবহু ‘ আপনাদের ভালোবাসা নিয়ে শেষ দিন মিথ্যা মামলায় কোর্ট এ ওঠছি খুব শীঘ্রই ফিরে আসব ইনশাআল্লাহ । মিথ্যা দিয়ে সত্যকে বেশি দিন আটকে রাখা যায় না। প্রিয় গৌরীপুরবাসী, আপনারা আমার অক্সিজেন এর মতো কাজ করেন। আপনাদের পাশে থাকতে পারাটা ,সুখ দুঃখ এর কথাগুলো শুনে যতটুকু সহযোগিতা আমার পক্ষে সম্ভব তা করার মাঝে যে তৃপ্তি পাই তা হয়তো কোটি টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব নয়। আমার দিন শুরু হয় যে সাধারণ মানুষের সাথে আবার দিন শেষও হয় সেই সাধারণ মানুষের কাছেই। যা আমি এ নির্বাচন এর পর থেকে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় পরে আপনাদের খেদমত করতে পারি নাই। সপ্তাহে ৪/৫ দিন ঢাকায় কোর্ট এ দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। তারপরও আমার মা বোনেরা যে পরিমাণ নামাজ, রোযা দোয়া আমার জন্য করছেন এতটুকু ভালোবাসার ঋণ হয়তো আমি ও আমার পরিবার শোধ করতে পারবো না। আপনাদের এই ভালোবাসার জন্যই আমার রাজনীতি করা আর এ জন্যই ষড়যন্ত্রকরে আমাকে আপনাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্যই এ মিথ্যা মামলায় আমাকে হয়রানি করা হলো । আপনারা সব কিছুই জানেন আমাকে ও আমার পরিবারকে এ হত্যাকাণ্ড কেন্দ্র করে আমার বাসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাড়ি থেকে শুরু করে আমাকে হত্যা করতেও চেয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা! যার সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে আপনারা তাদের ভয়ংকর রুপ দেখতে পেয়েছেন! আজ বৃহস্পতিবার মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়ে আমি ও আমার ছোট দুই ভাই আর্গোমেন্ট এর শেষ দিন কোর্ট এ ওঠছি। আজকে হয়তো সবার জামিন নামঞ্জুর করে জেলখানায় পাঠানো হবে আমাদের। সেই সাথে রায়ের তারিখও ঘোষণা করে দিবে। আশা করি খুব শীঘ্রই সকলের মাঝে ফিরে আসব। দোয়ার দরখাস্ত রইলো সকলের কাছে। যেন সত্য এর জয় হয়। বিশ্বাস করি সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্য যা ভালো তাই করবেন। সৃষ্টিকর্তা আরো পরীক্ষা নিতে চাইলে তার জন্যও প্রস্তুত আছি। তিনিই উত্তম ফয়সালাকারি। ভুল ত্রুটি চলার পথে যতটুকু করেছি কেউ মনে কষ্ট পেয়ে থাকলে মাফ চেয়ে নিচ্ছি।
মামলার বাদী আবিদুর রহমান প্রান্ত জানান, গৌরীপুরসহ তথা দেশবাসী দেখেছেন আমার জনপ্রিয় শুভ্র ভাইকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারপরে আমাকেও হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। আমার বাসা-বাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। মামলার স্বাক্ষী জাহাঙ্গীরের দোকানপাট জ¦ালিয়ে দেয়া হয়েছে। পুরো পরিবার ও সাক্ষীরা মৃত্যু আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটচ্ছে। আশা করি আমরা আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে পাবো।
জানা যায়, গৌরীপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ছিলেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান শুভ্র। ২০২০ সনের ১৭ অক্টোবর শহরের মধ্যবাজার পানমহালে নির্মমভাবে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের পর আ’লীগ ও তার সহযোগী সংগঠন বিচারের দাবিতে টানা ২১দিন সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচী পালন করে। ২০২১সনের ৫ মে বিজ্ঞ আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (বর্তমানে ময়মনসিংহ কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ) মো. শাহ কামাল আকন্দ। প্রতিবেদনে চার্জশীটভুক্ত ১৪জন ছাড়াও মামলার তদন্তকারী অফিসার অনুসন্ধানে আরো ৫জনের সম্পৃক্ত পাওয়ায় ১৯জনকে অভিযুক্ত করে এ প্রতিবেদন দেন। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোঃ মফিজুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত ২০২১সনের ৩০ নভেম্বর চিঠিতে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২২ নভেম্বর তারিখে প্রকাশিত গেজেটে এক প্রজ্ঞাপনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন-২০০২ (২০০২ সনের ২৮নং আইন) এর ধারা-৬ অনুযায়ী শুভ্র হত্যা মামলাটি (গৌরীপুর থানার মামলা নং- ২২, (১৯ অক্টোবর) দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। যার এস,আর,ও নং- ৩৪৫ আইন/২০২১। এরপর মামলাটি বিচার কার্যক্রম শুরু হয় দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যলে।
এদিকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে মামলার বাদী আবিদুর রহমান প্রান্তর বাসা-বাড়িতে ভাংচুর ও মামলার সাক্ষী মো. জাহাঙ্গীর আলমের দোকান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রান্ত জানায়, এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে গৌরীপুর থানার অভিযোগ দায়ের করেন। গৌরীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর/২০২২) নিহত শুভ্র’র ছোট ভাই আবিদুর রহমান প্রান্ত জানান, এ মামলার চার্জশীট দেয়ার পরের দিন ৬ মে আমাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। এখন মামলার রায় যতই দিনঘনিয়ে আসছে ততই আমরা আমাদের জীবন নিয়ে শংকিত। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আমার বাসা-বাড়ি এবং এ মামলায় সাক্ষী দেয়ার কারণে জাহাঙ্গীর আলমের দোকান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে চারটি দোকানের প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল ভস্মিভূত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আমার ভাই জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেও বাঁচতে পারেননি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ মামলার চার্জশিট দেয়ার পরের দিন আমাকেও মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। ওরা এখন বিচার চাওয়ায় আমাদেরকে হত্যা চেষ্টা করছে। আমরা জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি। সংবাদ সম্মেলনে এ সময় শুভ্র হত্যা মামলার সাক্ষী মো. জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন।