ময়মনসিংহের গৌরীপুরের প্রথিতযশা নেতা মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরীর বুধবার (৩ নভেম্বর/২১) ৫৪তম মৃত্যু বার্ষিকী। তিনি ১৯০৫সালে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিকদলে যোগ দেন। প্রবাদ বাক্য ব্যবহারের মাধ্যমে বক্তৃতায় মানুষকে আকৃষ্ট করেন। তিনি বোকাইনগরী খেতাব অর্জন করেন। তিনি কংগ্রেসের লাঙল প্রতিকে নির্বাচন করে কলকাতার এসেম্বলীর সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। ১৯৪৯সালে গৌরীপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৫৪সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ (যুক্তফ্রন্ট) এর নির্বাচনে এমএলএ নির্বাচিত হন। এ বছরই শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে কৃষক পাটিতে যোগদান করেন। ১৯৬৩সালে গৌরীপুর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭সালের এই দিনে মৃত্যু বরণ করেন।
মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী ১৮৭৬ইং সনে তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমার জয়শিদ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পীরবংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হযরত মুন্সী মোঃ তকী ছিলেন একজন পীরে কামেল লোক। আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী ৭ভাইয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন। মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি তার একমাত্র বড় বোনের কাছে থেকে বর্তমান নেত্রকোণা জেলার পুর্বধলার খলিশাপুর প্রাইমারী স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর তিনি একই জেলার মদনপুর মাদরাসায় আরবীতে পড়ালেখা করেন। ১৮৯৮ সালে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। সেখান থেকে তিনি চলে আসেন গৌরীপুর থানার বোকাইনগর গ্রামে এবং উক্ত গ্রামের অষ্টগড় প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। এখানে শিক্ষকতাকালেই তিনি এই গ্রামে অবস্থিত হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে একটি মক্তবে পড়াতেন এবং ধর্মসভা করতেন।
১৯১০সালে বোকাইনগর গ্রামের ফকির বাড়িতে শাহ্ মোঃ আবাল উদ্দিনের কন্যা ছফুরা খাতুনকে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন ৫পুত্র ও ৪কন্যার জনক।
১৯০৫সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিকদলের একজন কর্মী ছিলেন। তাঁরই অনুসারী হয়ে একজন ভাল বক্তা হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। বক্তৃতা দেবার সময় তিনি প্রবাদ বাক্য ব্যবহার করে গ্রাম্য ভাষার বক্তৃতা করতেন। তিনি নানাগুণের অধিকারী ছিলেন। গুনমুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘বোকাইনগরী’ উপাধি প্রদান করেন।
আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী কৃষক নেতা হিসাবে কংগ্রেসের দলীয় টিকেটে লাঙ্গল প্রতিক বরাদ্দ পান। নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে কলকাতার এসেম্বলির সদস্যপদ লাভ করেন। ওই এসেম্বলিতে বাংলায় বক্তৃতা নিষিদ্ধ ছিল। সে কারণে ওই অধিবেশনে তিনি বাংলা বক্তৃতা দিতে শুরু করলে স্পীকার তাঁকে বাংলায় বক্তৃতা দিতে নিষেধ করেন। কিন্তু তিনি তা অগ্রাহ্য করে বাংলাতেই পুরো বক্তব্য দেন। এসেম্বলিতে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেবার অধিকার নিয়ে তিনি আন্দোলন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাঁর আন্দোলনে সাড়া দিয়ে এ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। এ সময় তিনি কলকাতার গড়ের মাঠে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করেন। এইভাবে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়ে জনমত গঠন করে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেবার অধিকার আদায় করেন। তিনি এসেম্বলিতে জনগণের পক্ষে বহু বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও কলকাতার সদানন্দ পার্কে রাজনৈতিক জনসভায় বক্তব্য রেখে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন বলে জানা যায়।
১৯৪৯সালে তিনি গৌরীপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্ধন্ধিতা করে অত্র পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৫৪ সালে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ নূরুল আমিনকে নির্বাচনে পরাজিত করে আওয়ামী মুসলিম লীগ (যুক্তফ্রন্ট) থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন। সে বছরের মার্চ মাসে শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক যখন কৃষক পার্টিতে যোগদান করেন।
১৯৫৮সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি বিভিন্ন সভায় যোগদান করে বক্তব্য রাখেন। তাঁর সাথে প্রখ্যাত আইনজীবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভারতের মহাত্মা গান্ধীর সাথেও ছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক। তিনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথেও রাজনীতি করেছেন। অল ইণ্ডিয়া গণতন্ত্র মঞ্চে তার ইতিহাস রয়েছে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির ৫০বছর’, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এফ.এম আহসান উদ্দিন চৌধুরীর ‘স্মৃতি অমলিন’, লোক সাহিত্য বিশেষজ্ঞ ড. মাজহারুল ইসলামের ‘আমি স্মৃতি আমি ইতিহাস’ এবং প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মনিসিং রচিত ‘আমার জীবন সংগ্রাম’, কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার চাষী’, ১৯৪৪সালে প্রকাশিত . প্রভৃতি গ্রন্থাবলিতে গৌরীপুরের কিংবদন্তী এই কৃতি মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরীর রাজনীতির বর্ণনা উল্লেখ রয়েছে।
গৌরীপুর কলেজ প্রতিষ্ঠাতাকালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মৃর্তুর পুর্বপর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬৭সালের ৩ নভেম্বর প্রথিতযশা মৌলভী আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী ৮৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। নিজ বাড়িতেই তিনি সমাধিস্থ হন।