শ্যামল ঘোষ, গৌরীপুর ঃ
জন্ম থেকেই সংগ্রামী আব্দুল লতিব। মায়ের পেটে থেকেও দৌড়েছেন বহুপথ। শত্রু সেনাদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে- এ দৌড় ছিলো মায়ের। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে যুদ্ধের ধামাকা যখন চলছিলো ঠিক সেই সময় ভূমিষ্ট হন তিনি। সেটা ছিলো ১৯৭১’র ১০ডিসেম্বর। এরপরেই লড়েছেন ক্ষুধা আর দারিদ্রতার বিরুদ্ধে। কখনও বিজয়ী হতে পারেননি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের তেলিহাটি উত্তরপাড়ার মৃত নবী হোসেনের পুত্র আব্দুল লতিব।
এবার দুঃখজয়ের জন্য মোছাঃ মুর্শিদা খাতুনকে জীবন সঙ্গী করেন। তবে দুঃখ-কষ্টকে কখনও সরাতে পারেননি। গ্রামে কাজ নেই, কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। দুই পুত্র আর দুই কন্যাকে নিয়ে ৬জনের সংসার। তিনবেলার খাবারও জুটছিলো না। সেই দুঃখের ঝুড়ি লফিবের সংসারের সঙ্গ ছাড়েনি। তবে দুঃখ জয়ের নিশানা নিয়ে লক্ষে ছুটে যান রাজধানী শহর ঢাকায়। তখন ছোট কন্যা জান্নাতের বয়স মাত্র এক বছর। বড় ছেলে শরীফ মিয়া ৫ম শ্রেণির সমাপনি দিয়েছে। বড় মেয়ে লিজা ও পুত্র আশিক মিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। শুরু হয় তিন চাক্কার যান রিকশায় প্যাডেল মারা। রাজধানীর অলিগলিতে ছুটে চলেন দিনরাত। ছয় বছর অমানসিক পরিশ্রম করে নূতন আলোর সন্ধান পান তিনি। ভাগ্য সহায় হয় তার। সন্তানদের মুখে আহার তুলে দিতে পেরে সুখের হাসি হাসেন এই লতিব। জ্ঞানার্জনের জন্য সন্তানদেও বিদ্যাপীঠেও পাঠান।
তিনি জানান, বিরামহীন রিকশা চালিয়েছি। ছেলে-মেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেছি। স্কুলে পাঠিয়েও ছিলাম। সুখাছন্দ জীবন বেশিদিন ঠিক সই করেনি। সব স্বপ্ন কেড়ে নিলো ক্যান্সার আর করোনা। বড় ছেলে শরীফ মিয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় ২০১৯সালে। সন্তানকে বাঁচাতে সঞ্চিত সব অর্থ শেষ হয়ে যায়। এদিকে সন্তানের চিকিৎসা আর কভিড-১৯’র কারণে আমি কর্মহীন হয়ে পড়ি। কাজ নেই, বাসা ভাড়া, ওষুধ সবমিলে রাজধানী শহরে নিঃস্ব আমি। সন্তানের চিকিৎসা চালাতে হাত বাড়াই পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের ঘরেঘরে। তাদের দেয়া অর্থে শরীফে প্রথম কেমো দেয়া হলো। দ্বিতীয় কেমোর অর্থ যোগাড় করতে আবারও ছুটে চলি। সমাজসেবা অধিদপ্তরে আবেদন করেও সাড়া পাইনি। টাকা সংগ্রহ হচ্ছে না। নিজেও তিনবেলার খাবার যোগাড় করতে পারি না। অসহায় এই বাবার হাতে বিনাচিকিৎসায় আমার সন্তানের মৃত্যু হলো। কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। সমাজসেবার আবেদনও ফিরে এলো ৪মাস পর, কোন সহযোগিতা দেয়া হলো না।
তিনি আরো জানান, ২০২০সালের ২০ আগস্ট শরীফ চলে যায় না ফেরার দেশে। সন্তানের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরবো তারও টাকা ছিলো না। গ্রামের লোকজন চাঁদা তুলে আমার সন্তানের লাশ ঢাকা থেকে এনেছে। বাড়িতে কোন ঘর নেই, আছে শুধু মাথা গোঁঠার আড়াই শতক জমি! সেই থেকে বস্তার চটের নিচে স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে নিয়ে দিনযাপন করছি। ঝড়-বৃষ্টি আর তীব্র শীতের জীবন সংগ্রামেও একটি ঘর পাননি তিনি। অভাবের তাড়নায় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়রত লিজা আক্তারকে বিয়ে দিয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে আশিক মিয়া লেখাপড়া। একবছরের জান্নাত এখন প্রথম শ্রেণির ছাত্রী, ৭বছর বয়স। করোনাদুর্যোগের কারণে তারও যাওয়া হয়নি কোন বিদ্যালয়ে।
লতিবের স্ত্রী মোছাঃ মুর্শিদ আক্তার জানান, আমরা কাজ করো খাবো। সন্তানদের নিয়ে আর কোথাও যেতে চাইনা। শুধু একটু মাথাগোঁজার ব্যবস্থা করে দিন। এ প্রসঙ্গে বোকাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ হাবিব উল্লাহ জানান, কিছুদিন হলো ঢাকা থেকে এসেছে। একটি নলকূপের ব্যবস্থা করেছি। এই মুর্হূতের ঘরের বরাদ্দ নেই, আসলে একটি ঘর দেয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান মারুফ জানান, অসহায় এ পরিবারটির খবর পেয়েছি। দু’একদিনের মধ্যে সরজমিন যাবো। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।