প্রধান প্রতিবেদক :
ময়মনসিংহের গৌরীপুর সরকারি কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের অজুহাতে ভাঙা হচ্ছে জমিদার আমলে নির্মিত প্রাচীন কারুকার্য্যে ভরপুর পুরার্কীতির প্রত্নরত্নের ভবন! জমিদারের আড্ডা বা দরবারশালা খ্যাত এ ভবনটি ভেঙে ফেলায় ক্ষোভে ফুসছে এলাকাবাসী। সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি ‘ভেঙে ধ্বংস নয়, সংস্কার করে পুরার্কীতি সংরক্ষণ’।
কৃষ্ণপুর জমিদারের এ বাড়িতে ১৯৬৪সালের ১ আগস্ট জন্ম নেয় কলেজটি। ভাগীরথী দেবীর কন্যা কৃষ্ণমণিকে বিয়ে করায় যৌতুক হিসাবে এ তালুক দেয়া হয় গোবিন্দ প্রসাদ লাহিড়ীকে। কৃষ্ণমণি’র নাম অনুসারে এ এলাকার নামকরণও হয় কৃষ্ণপুর। কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর কৃষ্ণমণি’র দরবারশালাটিতে চলছিলো কমনরুম ও ছাত্র সংসদের কার্যক্রম। যা ভেঙ্গে ফেলা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
এ বিষয়ে গৌরীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম মিন্টু জানান, প্রাচীন স্থাপনাটি কলেজের ছাত্র সংসদের কার্যালয় ও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের কমন রুম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ভবন নির্মাণের অজুহাতে স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
জানা গেছে, ১৯৬৪ সালের ১ আগস্ট গৌরীপুর পৌর শহরের কৃষ্ণপুর এলাকায় জমিদার সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ীর বাড়িতে গৌরীপুর সরকারি কলেজের যাত্রা শুরু হয়। ২২ একর জমির উপর গড়ে উঠে দৃষ্টিনন্দন কলেজটি। প্রাচীন নিদর্শন, সুপ্রশস্ত মনোরম ক্যাম্পাস ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠটি ক্রমেই দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়।
১৯৯১ সালে কলেজটি সরকারিকরণ হয়। ২০১২ সালে কলেজে অনার্স কোর্স চালু হয়। এ অবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেলে দেখা দেয়ে ভবন সংকট। সম্প্রতি কলেজে ভবন নির্মাণের জন্য একটি প্রাচীন স্থাপনা ভাঙার কাজ শুরু হয়। বুধবার থেকে স্থাপনা ভাঙার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় উঠে। কলেজে বিকল্প জায়গা থাকার পরেও কেন প্রাচীন নিদর্শন ভেঙে ভবন নির্মাণ হচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেন বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলেজের অধ্যক্ষ ভবনের পাশে প্রাচীন স্থাপনাটি ভাঙার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে একতলা ছাদবিশিষ্ট স্থাপনাটির উপরিভাগ ভেঙে ফেলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি অংশ ভাঙা হবে বলে জানান নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা। গৌরীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন জুয়েল বলেন, ‘একাধিক ভবন নির্মাণের জন্য গৌরীপুর সরকারি কলেজের নিজস্ব অনেক জমি খালি পড়ে রয়েছে। আমাদের দাবি ওইসব খালি জমিতে ভবন নির্মাণ করা হোক। পাশাপাশি ঐতিহাসিক নিদর্শনটি না ভেঙে এর অবকাঠামো ঠিক রেখে দৃষ্টিনন্দন ভাবে সংস্কার করা হোক।’ ভবন ভাঙার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান এসো গৌরীপুর গড়ি সংগঠনের সমন্বয়ক আবু কাউছার চৌধুরী রন্টি।
গৌরীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান ফকির জানান, নতুন ভবন নির্মাণের নামে প্রাচীন ভবন ভাঙা ঐতিহ্য নষ্ট করা নিন্দীয় কাজ। সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অপরিকল্পিত সংস্কার ও নির্মাণ কাজের জন্য কলেজের প্রাচীন নিদর্শনগুলো ধ্বংস হচ্ছে। কয়েক বছর আগে সংস্কারের নামে কলেজের প্রবেশ পথে প্রাচীন ভবনের উপরিভাগের একাংশ ভেঙে ফেলা হয়। গৌরীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, সরকারি কলেজে বিপুল জমি রয়েছে। ভবন না ভেঙ্গেও নতুন শত ভবন করার মতো স্থান রয়েছে।
এ বিষয়ে গৌরীপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মিল্টন ভট্টাচার্য জানান, প্রাচীন স্থাপনাটির অবকাঠামো দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এটি সংস্কার করে সংরক্ষণের সুযোগ নেই। স্থাপনাটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত পড়েছিল। তাই ভবন নির্মাণের জন্য যথাযথ নিয়ম মেনে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এটি ভাঙা হচ্ছে। তবে কলেজের যে সকল প্রাচীন নিদর্শন সংস্কার করার সুযোগ রয়েছে সেগুলো সংস্কার করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
টি.কে ওয়েভ-ইন