গন্তব্যহীন এক যাত্রা। রাজপথ তখন তাদের ঠিকানা। আহত সহযোদ্ধা, সামনে পুলিশের গুলিবর্ষণ, যুবলীগ-ছাত্রলীগের আক্রমণ। এমন বিপর্যয়েও জুলাইযোদ্ধা আফরোজার চোখে চোখ রাখলো আরেক সহযোদ্ধা মোমেন। সেই থেকে ভালোবাসা-ভালোলাগা আর প্রেমের শুভসূচনা। তবে তখন সারাদেশে যুদ্ধ, যুদ্ধাবস্থা প্রেমও গন্তব্যহীন! ছিলো চরম অনিশ্চয়তা এবং জীবনের ঝুঁকি। তবে প্রেম যুদ্ধ বুঝে না, গন্তব্য জানে না শুধু জানে দু’টি হৃদয়ে এক ও অভিন্ন আকাংখা। আফরোজা রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও তার স্বামী মোমেন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সহসম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছে।
তারই প্রমাণ করলেন ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ২৪ জুলাই গণঅভ্যূত্থানে আহত (গেজেটভুক্ত) জুলাইযোদ্ধা আফরোজা বেগম। রোববার (১৪ জুন/২৬) তাদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আফরোজা পৌর শহরের গোলকপুর গ্রামের মো. আব্দুল মান্নানের কন্যা। বিয়ে হয় পৌর শহরের পূর্বভালুকা গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের পুত্র মোকশেদুল মোমেন০।
২০২৪সনের ২০জুলাই ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। জুলাই গণঅভ্যূত্থানে এই দিনে ৩জন শহীদ হন। তারা হলেন উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের চুড়ালী গ্রামের মো. বাবুল মিয়ার পুত্র বিপ্লব হাসান, মইলাকান্দা ইউনিয়নের পূর্বকাউরাট গ্রামের জোবায়ের আহম্মেদ ও রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাঁও গ্রামের নুরে আলম সিদ্দিকী রাকিব। জুলাই বিপ্লবে দেশে প্রথম কারফিউ ভেঙ্গে এ আন্দোলন সংঘটিত হয়। এ আন্দোলনে ছিলেন আফরোজা ও মোমেন।
আফরোজা জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নিয়ে ওই বছরের ১৭ জুলাই গৌরীপুর সরকারি কলেজ থেকে একটি মিছিল বের করে। সেই মিছিলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ হামলা করায় তিনি আহত হন। আহত এ যোদ্ধাকে সেবা-যত্ন করতে গিয়ে পরিচয় হয় মোমেনের। ১৮ জুলাই মিছিলের দিনে তার অসুস্থ্য ছিলো। ২০জুলাই আন্দোলনে যান কলতাপাড়া। সেখানে শহীদ জোবায়েরের লাশ নিয়ে হাসপাতাল থেকে ওর বাড়িতে যান তিনি। এ আন্দোলন-সংগ্রামে সহযোদ্ধা মোমেন পাশে ছিলো। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রতিনিয়ত তার সাথে কথা হতো। এ সংযোগের মধ্যেই ভালোলাগার সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও জানায়, আমাদের এই ভালোলাগার কথা আমি আমার পরিবারকে জানাই। সেও তার পরিবারকে জানায়। উভয় পরিবারের সম্মতিতে আমাদের প্রণয় এবং এই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। আশা করি আমার স্বামী হিসাবে তিনি আমাকের সর্বোচ্চ দেখভাল করবেন। আমি সবার নিকট দোয়া চাই।
মোমেন জানায়, আন্দোলনের কারণে মামলার আসামী। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকায় পুলিশ টার্গেটে পরিণত হই। আফরোজা আহত সেই খবর পাওয়ার পর হাসপাতালে দেয়াল টপকিয়ে দেখতে যাই। সেখানেও পুলিশ ধাওয়া দেয়। দু’জনের কথা হতো, একদিন ভালোলাগার কথা ওকে জানাই। সে বলেছিলো, পরিবার রাজি থাকলে সেও রাজ হবে। এমন শর্তেই চলছিলো আমাদের দিনলিপি। আমিও বলছিলাম, এ সরকার থাকলে তো আর কিছু হবে না। সুতরাং আন্দোলনেই মুক্তিপথ। প্রতিনিয়ত আন্দোলন-নিয়মিত সাহস যোগাতো আফরোজা। ফ্যাসিস্ট বিদায় হলেও আমাদের স্বস্তি ছিলো না। তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, নিজের দল (বিএনপি) ক্ষমতা না আসলে বিয়ে করবো না। দল ক্ষমতায় এসেছে, প্রতিমন্ত্রী পেয়েছি। পরিবারও রাজি হয়েছে, তাই আজকের এই শুভক্ষন। সবার নিকট দোয়া চাই।
তিনি আরও জানান, সেই আন্দোলনের মামলায় শনিবার (১৩ জুন/২৬) রাতেও পুলিশ হানা দেয়। আমাদের সরকার এলেও সেই গায়েবী মামলা এখনও প্রত্যাহার হয়নি।
তার বোন রাহিমা খাতুন জানায়, জুলাই আন্দোলনে ওদের পরিচয় ও প্রেম হয়। আজ বিয়ে হলো। আমরা একটি মিষ্টি ভাইবউ পেয়েছি। ওদের জন্য দোয়া চাই।
ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নুরুজ্জামান সোহেল জানায়, জুলাই আন্দোলনে আমাদের অনেক সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। ওরা বেঁচে আছে! সেই আন্দোলনে পরিচয়, ভালোলাগা ও প্রেম। আজকে সেই প্রেমের উপখ্যানের সফল সমাপ্তি হলো। তাদের জন্য শুভ কামনা।
বিয়ের এ উৎসবে জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও এলাকাবাসী অংশ নেন।