এমন পরিস্থিতিতে আজ বুধবার নবমবারের মতো সারা দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মানসম্মত হেলমেট ও নিরাপদ গতি, কমবে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পরিবহন যেমন বেশির ভাগ দুর্ঘটনার মূল কারণ, তেমনি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়াচ্ছে।
বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল : দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরে অনিরাপদ অটোরিকশা, নছিমন, ভটভটি চলাচল করছে কোনো নিবন্ধন বা নিরাপত্তা মান ছাড়াই। তা ছাড়া এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নীতিমালা নেই। বরং গত এক বছরে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে এই যানের কারণে বেড়েছে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার।
নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবহনের অভাব : দেশের নগর পরিবহন এখনো নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। বাংলাদেশ রোড সেফটি নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, নগর গণপরিবহনে যাতায়াতকারী ৮৩ শতাংশ নারী শারীরিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হন। বেশির ভাগ শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য গণপরিবহনে চলাচল প্রায় অসম্ভব বিষয়।
রাজনৈতিক প্রভাব ও চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য : গণপরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক প্রভাব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের ছত্রচ্ছায়ায় পরিবহন খাতে চলছে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি। গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবহন ব্যবস্থা গঠনের দাবি উঠেছে, কিন্তু সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থাগুলো এতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।
নেই সাইকেল লেন, হাঁটার জন্য নিরাপদ ফুটপাত : রাজধানীর আগারগাঁও ও মানিক মিয়া এভিনিউয়ে সাইকেলের জন্য বিশেষ লেন তৈরি করা হলেও সরকারি-বেসরকারি গাড়ি এসব লেনে পার্ক করা থাকে। ফলে এসব লেনের কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। কথা দিলেও নতুন করে এমন কোনো লেন নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে না কোনো সিটি করপোরেশন। রাজধানীর বেশির ভাগ ফুটপাতই ভাঙাচোরা, বেদখল হওয়ার কারণে হাঁটার অনুপযোগী। ফলে ঝুঁকি নিয়েই সড়কে হাঁটতে হয় নাগরিকদের।
পরিবহন সংস্থাগুলোর দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতা : দেশের পরিবহন খাতের ব্যবস্থাপনায় সরাসরি যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন (বিআরটিসি) ও ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ)। তবে বাস্তবে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে যোগাযোগ বিষয়ে অভিজ্ঞ ও টেকনিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের বদলে প্রায়ই প্রশাসন ক্যাডার থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিছুদিন কাজ করার পর তাঁরাও প্রমোশন ও বদলি হয়ে অন্যত্র যান। ফলে নতুন করে আবারও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা দায়িত্ব পান। তা ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের নিজেদের মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সহায়তায় অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠানকে (সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ) এগিয়ে আসতে দেখা যায় না।
নিষ্ক্রিয় জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, খসড়ায় আটকে আধুনিক আইন : বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে নীতি নির্ধারণ ও সমন্বয়ের সর্বোচ্চ সংস্থা হলো জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী এই কাউন্সিলের প্রধান হন এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এর সদস্য। নীতি প্রণয়ন, সুপারিশ প্রদানসহ সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এই সংস্থা প্রায় নিষ্ক্রিয়। হয় না নিয়মিত বৈঠক ও কার্যক্রম।
কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি বিভিন্ন সংগঠনের : দেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে নানা দাবি জানিয়ে আসছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। রোড সেফটি নেটওয়ার্ক ১৯টি দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে টেকসই পরিবহন কৌশল গ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের দাবি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি তাদের ১২ দফা দাবিতে নৌ, রেল ও সড়কপথের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত যাতায়াত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দৌরাত্ম্য রোধ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ডিজিটাইজ করাসহ নানা প্রস্তাব দিয়েছে।
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা, চালকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাগুলো। সড়ক পরিবহন ও দুর্ঘটনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, যেসব সংকটের কথা বলা হচ্ছে, এগুলো কমন এবং এগুলোই সড়ক অনিরাপদ হওয়ার কারণ। এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিলে দুর্ঘটনার পরিমাণ যেমন কমবে, তেমনি প্রাণহানির মাত্রাও অনেক নেমে আসবে। এসব সমস্যা সমাধান করা তেমন কঠিন নয়, প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা। কিন্তু এখানে বড় বাধা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা।