ময়মনসিংহে ১৬৯৯ সালের তৈরি একটি মুদ্রণযন্ত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। মুদ্রণযন্ত্রের গাঁয়ে খোদাই করে লেখা তৈরির সাল অনুযায়ী মুদ্রণযন্ত্রটি ৩২৬ বছর আগের; যা মুদ্রণশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। তবে মুদ্রণযন্ত্রটি কবে কার হাত ধরে ময়মনসিংহে এসেছে বা কবে বন্ধ হয়েছে- সেটি অজানা।
নগরীর মৃত্যুঞ্জয় স্কুল রোডের একটি অরক্ষিত স্থানে মুদ্রণযন্ত্রটির দুটি অংশ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হলে পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের একটি প্রতিনিধি দল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা প্রাচীন মুদ্রণযন্ত্রটি পরিদর্শন করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মুদ্রণ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অনাথ বন্ধু গুহ তার ছাপাখানায় এই মুদ্রণযন্ত্রটি ব্যবহার করতেন। এরপর গফরগাঁওয়ের মাওলানা পাঁচবাগী এই মুদ্রণযন্ত্রটির শেষ ব্যবহারকারী ছিলেন।
এদিকে মুদ্রণশিল্পের অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিত্যক্ত যন্ত্র দুটিকে সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদনের কথা জানিয়েছেন পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্যরা।
স্থানীয় চা দোকানি সুশীল চন্দ্র দে জানান, ১৯৯৭ সালে এই এলাকায় বসবাসের সুবাদে দেখেছি একটি টিনের চৌচালায় ছাপাখানা চলছে। এর কয়েক মাস পর থেকে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ছাপাখানার পাশেই দৈনিক চাষী নামে একটি পত্রিকার অফিস ছিল। সেটিও এখান থেকে বের হতো বলে তার ধারণা। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পোস্টার ও লিফলেট ছাপা হতো এই মুদ্রণযন্ত্রটি দিয়ে।
পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ইউরোপে ১৫ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুদ্রণ শিল্পের প্রসার ঘটে। বিশেষ করে ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে জার্মান উদ্ভাবক জোহানেস গুটেনবার্গ কর্তৃক ধাতব চলনশীল অক্ষর ব্যবহার করে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। ভারতীয় উপমহাদেশে ছাপাখানার প্রসার ঘটে পর্তুগিজদের হাত ধরে। ১৫৫৬ সালে গোয়ায় পর্তুগিজরা প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করে।
তিনি বলেন, এরপর ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তি ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুদ্রণ শিল্প প্রসারিত হতে থাকে, যার প্রভাব প্রাচীন নগরী ময়মনসিংহেও পড়ে। এই মুদ্রণযন্ত্রটি ১৬৯৯ সালে নির্মিত, যা মুদ্রণ শিল্পের অনন্য নিদর্শন। পূর্ব প্রজন্মের প্রগতিশীল মানুষদের হাত ধরে এই প্রাচীন মুদ্রণযন্ত্রটি ময়মনসিংহে এসেছে।
পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও গবেষক স্বপন ধর বলেন, মুদ্রণযন্ত্রটি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি। মোটামুটিভাবে যেটি পাওয়া গেছে, তা হলো ১৮৬৬ সালের দিকে হরচন্দ্র চৌধুরী শেরপুর থেকে মুদ্রণযন্ত্রটি ময়মনসিংহে নিয়ে আসেন। তারপর ১৯৪৭ সালে মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অনাথ বন্ধু গুহ তার প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানায় সেই মুদ্রণযন্ত্রটি ব্যবহার করতেন। কয়েক বছর ব্যবহারের পর গফরগাঁওয়ের মাওলানা পাঁচবাগীর হাতে ছাপাখানার দায়িত্ব যায়, যা স্বাধীনতার পর পর্যন্ত চলমান ছিল। সেখান থেকে চাষী পত্রিকাসহ রাজনৈতিক ব্যানার-পোস্টার-লিফলেট ছাপানো হতো। সর্বশেষ ছাপাখানাটি কারা পরিচালনা করত তা বের করার কাজ করছি। তবে আমরা চাই যেহেতু মুদ্রণযন্ত্রটি পুরাকীর্তির নিদর্শনস্বরূপ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যেন এটিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
সাপ্তাহিক চাষী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এটিএম নুরুদ্দীনের বড় ছেলে আ স ম মঈনুদ্দিন কবীর জানান, এই ছাপাখানার সঙ্গে আমাদের পত্রিকার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সাপ্তাহিক চাষী পত্রিকা স্বদেশী বাজার নিজস্ব প্রেসে ছাপা হতো। গফরগাঁওয়ের মাওলানা পাঁচবাগী এই মুদ্রণযন্ত্রটি চালাতেন এইটুকু জানি।