স্ত্রী’র ৫০টাকা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গিয়েছিলো তার স্বামী। স্বামী হারানোর পর এবার স্বামীর গৃহও হারাতে হয়েছে তাকে। তিনি হলেন ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার কাউরাট গ্রামের শহিদ জোবায়ের আহম্মেদের স্ত্রী মোছা. মারজিনা আক্তার। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যূত্থানে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে উপজেলার কলতাপাড়ায় ২০জুলাই তিনি পুলিশের গুলিতে শহিদ হন।
সেদিন স্বামীর লাশ দেখে সজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন তার স্ত্রী মারজিনা। একপর্যায়ে তার হাত-পায়ের শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। সুচিকিৎসার জন্য তাকে চলে যেতে হয় বাবার বাড়িতে। তিনি ঈশ^রগঞ্জ উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের বৃ-পাচাশী গ্রামের মো. শহীদুল্লাহ’র কন্যা।
মারজিনা আক্তার জানায়, তিনি অসুস্থ্য হওয়ার পর স্বামীর বাড়িতে থেকে তারা পাঠিয়ে দেয়। বাবার টাকায় সুস্থ্য হলাম। তারপরে তারা (শ^শুড়-শ^াশুড়ি) কোনো খোঁজ নেয়নি। আমি যাওয়ার পরেও ভালো ব্যবহার করছে না। স্বামীর আত্মার শান্তির জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে, সেখানে যাওয়ার পর তারা খারাপ আচরণ করছে। বাড়িতে থাকতে দেয়নি। বের করে দিয়েছে। মা সঙ্গে গিয়েছিলো মাকে বলেছে, মেয়ের সবকিছু নিয়ে বেড়িয়ে যান। আর কোনোদিন আসবেন না। আমি কি কখনও আসতে বলেছি!
তিনি আরও বলেন, ৪মাস চলে গেলো; আমার তো সব অন্ধকার। স্বামী হারালাম, স্বামীর গৃহও হারালাম। বিয়ের পরে দেয়া স্বর্ণালংকার ছিলো, সবই নিয়ে গেছে। একটু সুখের আশায় সব বিক্রি করে স্বামীর ব্যবসা শুরু করলো। দোকানের মালামাল জিনিসপত্র, সহায়-সম্পদ সবই তাদের হয়ে গেলো। আমি তো এখন শূন্য! স্বামীর সম্পদ বলতে, তার ঘ্রাণ নেয়ার জন্য ‘বিয়ের পাঞ্জবীটা, একটি টি-শার্ট আর একটি টাওয়াল’ নিয়ে এসেছি।
মারজিনা আক্তার বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আমার স্বামী শহিদ হলো, এখন তো আমিও বৈষম্যের শিকার হয়েছি। শুনেছি, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা অনুদান দিচ্ছে; কেউ তো আমার খবর নিলো না। কোনো সংস্থা এক টাকাও দেয়নি। আমার স্বামী হারিয়েছি, আমি তো সব হারিয়েছি, নি:স্ব হয়ে গেছি!
মারজিনার বাবা মো. শহীদুল্লাহ জানান, মেয়ের জামাই নেই; মেয়ে অসুস্থ্য। মেয়েকে সুস্থ করার জন্য একেকবার একেক ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছি। সেতো মানসিকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলো। আমার ২ ছেলে আর ৩ মেয়ের মধ্যে সে ৪র্থ। তাকে ভালো করার জন্য পরিবারের সবাই অস্থির হয়ে পড়ে। প্রায় ৪০হাজার টাকা তখন ব্যয় হয়।
শহিদ জোবায়ের আহম্মেদের শ^াশুড়ি মোছা. মনোয়ারা খাতুন বলেন, ৪০দিনের মিলাদ অনুষ্ঠান ছিলো। আমরা যাওয়ার পর তারা (মারজিনার শ^শুড় বাড়ির লোকজন) ভালো ব্যবহার করে নাই। মেয়েটার তারা খোঁজও নেয়না, নিয়ে যাওয়ার পর সেই বাড়িতে ঠাঁইও দেয়নি। তারা কখনও এ কথা বলে না, যে জোবায়ের নেই; তুমি তো আছো, থাকো আমরা তো আছি। বরং কেন গেছে, কেন গেলো; যা আছে সবকিছু নিয়ে বেড়িয়ে যান, এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আমাদেরকে বের করে দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শহিদ জোবায়ের আহম্মেদের পিতা মো. আনোয়ার উদ্দিন বলেন, আমি ছেলে হারিয়েছি। পুত্রবধূকে এখানে আমি কিভাবে রাখবো, ওরতো নিরাপত্তার দরকার আছে, তাই নিরাপত্তার জন্যই ওর বাবার বাড়িতে যেতে বলেছি। আমি তার পরিবারকে বলেছি, সে তো স্বামীর মোহরানা পাবে, পরবর্তীতে বিয়েসাদী হলে তখন সহযোগিতা করা হবে। তিনি আরও বলেন, পুত্রবধূ আমার ছেলের পাসপোর্ট চায়, ওর ভোটার আইডি চায়, এগুলো নিয়ে সে কি করবে? এসব নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাকিল আহমেদ বলেন, জোবায়ের আহম্মেদের স্ত্রী এসেছিলেন। তিনি স্বামীর অংশ হিসাবে যা প্রাপ্য সেটুকু অবশ্যই পাবেন। দু’পরিবারকে নিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ নিবো।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ‚্যত্থানে ২০ জুলাই গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় ৩জন শহিদ হন। তারা হলেন ডৌহাখলা ইউনিয়নের চুড়ালী গ্রামের বাবুল মিয়ার পুত্র বিপ্লব হাসান (১৯), রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাঁও মধ্যপাড়ার আব্দুল হালিম শেখের পুত্র নুরে আলম সিদ্দিকী রাকিব (২২) ও মইলাকান্দা ইউনিয়নের কাউরাট গ্রামের মো. আনোয়ার উদ্দিনের পুত্র জোবায়ের আহম্মেদ (২২)।
কোটা বিরোধী প্রত্যেকটি আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিজের দোকান বন্ধ করে ময়মনসিংহ চলে যেতেন জোবায়ের আহম্মেদ। তবে স্ত্রীকে বলতেন ক্রিকেট খেলতে যাত্রী। ২০২৩সনের জুন মাসে পারিবারিকভাবেই জোবায়ের-মারজিনার বিয়ে হয়। তবে সার্টিফিকেটে জোবায়ের বয়স কম থাকায় বিয়ে রেজিষ্ট্রি হয় এ বছরের ১৪ এপ্রিল।
এ আন্দোলনে অংশ নিতে স্ত্রীকে বলতেন খেলতে যাবেন। তার প্রিয় খাবার ছিলো গরুর মাংস আর ডিম। ২০জুলাই সকালে ছোট মাছের সঙ্গে বেগুন-আলু’র তরকারির সাথে ছিলো ডিম ভুনাও। খাওয়া-দাওয়া সের কলতাপাড়ার আন্দোলনে যেতে জোবায়ের আহম্মেদ নিত্যদিনের মতো সকালেই প্রস্তুতি নেন।
এ প্রসঙ্গে মোছা. মারজিনা আক্তার বলেন, আমার নিকট থেকে ৫০টাকা নিয়ে খেলায় (আন্দোলন) যাচ্ছি বলে বেড়িয়ে পড়লো। বললো চিন্তা করো না, চলে আসবো, এখনই চলে আসবো। এলোও, লাল সাইরেন বাজিয়ে, লাশ হয়েছে। কথাগুলো বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
শহিদ জোবায়ের আহম্মেদের লাশ আন্দোলনকারীরা বাড়িতে ওইদিনেই পৌঁছে দেয়। ছেলের জানাযায় ইমামতি করেন তার বাবা মো. আনোয়ার উদ্দিন। জোবায়ের কাউরাট আকবর আলী দাখিল মাদরাসা থেকে ৮ম শ্রেণি পাশ করেন। এরপরে গৌরীপুর টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এসএসসি পরীক্ষা দেন। এক বিষয়ে ক্রস থাকায় আবারও পরীক্ষা দেন। এ কারিগরী কলেজ পড়া অবস্থাতেই পুরাতন মোবাইল কেনার ব্যবসা শুরু করেন। শম্ভুগঞ্জ এলাকায় দোকান ভাড়া নিয়ে তিনি পুরাতন মোবাইল কিনে তার যন্ত্রাংশ বিক্রি করতেন। একপর্যায়ে ব্যবসার পরিধি ব্যাপকতা হলে তিনি নিজে ভারত থেকে চীন থেকে মোবাইলের যন্ত্রাংশ আমদানি এবং নতুন মোবাইল ফোন আমদানি করতেন। এছাড়াও পুরাতন মোবাইলের যন্ত্রাংশও রপ্তানি করতেন তিনি। তার আয়ে পুরো সংসারটি ঘুরে দাঁড়ায়।
তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের পূর্বকাউরাট গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিনের পুত্র। ৬ কন্যা আর ৩ পুত্র সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ৮ম। জোবায়েরের বড় বোন উম্মে হানিফ শ্যামগঞ্জ ফাজিল মাদরাসার কামিল পরীক্ষার্থী। সবার ছোট ভাই মো. কাউসার আহাম্মদ একই মাদরাসা থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।