সালটা দুই হাজার পনেরো। চৈত্রের বুক চিরে বৈশাখকে বিদায় জানিয়ে জ্যৈষ্ঠের আগমন। তারই রেশ কাটিয়ে আষাঢ়ের প্রারম্ভেই লাবনীর সাথে আমার দ্বিতীয় দেখা। এর ঠিক কতদিন পূর্বে আমাদের দেখা হয়েছিল সঠিক মনে নেই। লাবনী আমার মামাতো বোন। আমার জন্ম মাতুল বাড়িতে। সেখান থেকেই কৈশোরে বেড়ে উঠা। যার কারণে লাবনী’ই ছিল আমার একমাত্র পড়ালেখা ও খেলার সাথী।
আমার মামার বাড়ি অজপাড়া গাঁয়ে। ঋতুর সাথে সেখানকার মানুষের গভীর মিতালি। প্রতিটা ঋতুই আমাদের নতুন আনন্দ এনে দেয়। তন্মধ্যে বর্ষাকাল আমার খুবই প্রিয়। আষাঢ়ের ঢল বর্ষাকে নতুন রূপ এনে দেয়। মফঃস্বল শহরে এই আনন্দের রেশটুকুও নেই। রৌদ্রতপ্ত বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠে, ঠিক সেই মুহুর্তেই আষাঢ় মাস সতেজ প্রলেপ নিয়ে আসে। বঙ্গদেশে আষাঢ় মাস কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আষাঢ় যতটা আনন্দের, ঠিক ততটাই বেদনার। কখনো আষাঢ় আসে মনকে সতেজ করতে। আবার কখনো চোখ ভিজিয়ে দেয় বানের জলে। বাড়িঘর ভাসিয়ে দেয় খড়-কুটোর মত। উড়িয়ে নেয় আনন্দের রেশটুকুও। তাই বলে আমি আষাঢ়কে দোষারোপ করবো না। আষাঢ়ের রূপ এমন নয়।
আষাঢ় এলেই মন উচাটন করতো কখন বৃষ্টি নামবে। আম কুঁড়ানোর বায়না ধরে বেড়িয়ে পড়বো লাবনীকে নিয়ে। নানা-নানীর কাছে গল্প শোনার জন্য কখন উৎপেতে বসবো। এখন শুধুই স্মৃতি।
রিমঝিম বৃষ্টিতে ভিজে স্কুলে যাওয়া। ভেজা শরীরে ক্লাস করা। আবার পিছলিয়ে মাটিতে লুটোপুটি খাওয়ার সেই দিনগুলো আজ আর নেই।
তাই মান্না দে’র সেই কালজয়ী গানটি বলতে হয়-
কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই।
কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই, আজ আর নেই।
আষাঢ় মাসের সঙ্গে বাঙালির জীবন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে গল্প বলার প্রক্রিয়া। বাহিরের সকল রাস্তা যখন কর্দমাক্ত ঠিক সেই মূহুর্তেই ঘরের ভিতর চলতো মুড়ি ভর্তা আর গল্প বলার প্রতিযোগিতা। কেউ বলতো গল্প, কেউ গাইতো গীত। আবার কেউ গল্পের গরুকে গাছে চড়িয়ে বসতো অনায়াসে। কতই না আনন্দের ছিল সেই দিনগুলো।
গল্পে কল্পনার ফানুস উড়িয়ে এখন আর চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া হয় না। যান্ত্রিক শহরে সবাই এখন ব্যস্ত। চাইলেই কাঁদা মাটিতে লুটোপুটি খেয়ে বাড়ি ফেরা যায় না। গল্প করা কিংবা গীত গাওয়ার সেই সময়টুকু কারোরই হাতে নেই।
আষাঢ় এলো। আষাঢ় এলেই মনে পড়ে লাবনীর কথা। খুব বেশি মনে পড়ে মামা বাড়িতে কাটিয়ে দেওয়া আমার কৈশোর। অলস দুপুরে যখন বৃষ্টি নামে, খুব ইচ্ছে করে ভিজিয়ে দিই সারা দেহ। আবারো গল্পে বসি গামলা ভর্তি মুড়ি নিয়ে। গল্পের ফানুস উড়িয়ে হারিয়ে যাই কল্পনার রাজ্যে।
এখন কিছুতেই হয়ে উঠে না আমার চাওয়া। বৃষ্টি নামলে ঘরে বসে একাই গান করি। নিজে শিল্পি, নিজেই শ্রোতা। অবশ্য এতেও একটা আনন্দ আছে। এভাবেই কেটে যায় আমার বৃষ্টির বেলা। কেটে যায় আমার আষাঢ় মাস। তবুও ইচ্ছে করে ফিরে যেতে আমার কৈশোরে।
তাই তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দু’টি চরণ বলতে হয়ঃ-
“রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা,
এমন কেন সত্যি হয় না আহা!”
রাজিব হাসান রাজ, গৌরীপুর, ময়মনসিংহ।