কাঁটা-ছেড়া-পচাগলা লাশ বহনে অনুভূতিহীন এক মানুষ! হাতে নেই গ্লাভস। দেহের ছিন্নভিন্ন হাত-পা, মাথা ভ্যানে তুলছে সহসায়। গায়ে আতর মাখেন না। নাকে-মুখে রুমাল চাপতে হয় না তার। তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার ‘লাশের ভ্যানচালক’ আব্দুল বারেক! সবার পরিচিত ও প্রিয়মুখ।
যেখানে অস্বাভাবিক মৃত্যু, সেখানেই লাশ আনতে ছুটে যান তিনি। বিচিত্র এ পেশায় কেটেছে প্রায় ২৫টি বছর। বহন করেছেন সহস্রাধিক লাশ। আর সাংবাদিকদের চোখে- বারেক বের হচ্ছে মানেই ‘লাশের খবর’।
শরীরের একটু রক্ত বের হলে জ্ঞান হারানো সেই মানুষটির জীবিকার তাগিদে বদলে গেছে অনুভূতি শক্তিও। আজ বারেকের মনে নেই ডর-ভয়। তবে ফোন বাজলেই আঁতকে উঠেন। এ বুঝি লাশের খবর এলো। এই লাশ বহন করে চলে তার সংসার।
আব্দুল বারেক জানান, পরিচয়বিহীন হলে লাশের ময়নাতদন্ত ও বহনের জন্য দারোগা বাবুর নিকট থেকে পান ৩/৪ হাজার টাকা। তবে ময়নাতদন্তে খরচ হয়ে যায় দুই হাজার টাকা। লাশের ওয়ারিশান থাকলে অবশ্য ৪-৫ হাজার টাকা নিতে পারেন। এ উপার্জনেই চলছে ৬ জনের সংসার।
আব্দুল বারেক শহরের ছয়গণ্ডার মৃত মফিজ উদ্দিনের পুত্র। বয়স ৬৫ বছর ছুঁইছুঁই করছে। রয়েছে মাত্র দেড় শতাংশের মাথা গোঁজার ভিটেমাটি। দাম্পত্য জীবনে দুকন্যা সন্তানের জনক। মেয়ে রেখা ও মিনাকেও বিয়ে দিয়েছেন। এখন স্ত্রী আবেদা খাতুন আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে সংসারের আকারও বড় হয়েছে।
কখন লাশের খবর আসবে এ নিয়ে থানায় চলে বারেকের প্রতীক্ষার প্রহর। তবে নেই সরকারি বেতন-ভাতা। কোনো ঈদ-নবান্ন-বৈশাখেও জোটে না সরকারের উৎসবভাতা। বয়সের ভারে নুয়ে-পড়া জীবনে কমছে শারীরিক শক্তি। তাই চাচ্ছেন ভ্যানের শক্তি বাড়াতে, তার প্রয়োজন একটি মোটর। যার মূল্য প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা। তবে এ টাকা জোগাড়ে নেই তার সামর্থ্য।
বারেক জানায়, গত মাস তার ভালোই কেটেছে। এ মাসে অজ্ঞাতনামা, অপমৃত্যু ও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ জনের লাশ বহন করে প্রায় ১২ হাজার টাকা উপার্জন করতে পেরেছে। লাশ নিয়ে তার মনে আজ আর কোনো ভয় নেই। তবে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা সড়কে গভীর রাতে একাকি ২টি লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় একটি ঘটনা মনে পড়লে তিনিও এখনও আতঙ্কে উঠেন।
সেদিনের বর্ণনায় বলেন, রাত ৯-১০টা হবে। নিহত দুই ডাকাতের লাশ নিয়ে যাচ্ছি। তীব্র শীতে ফাঁকা সড়ক কুয়াশায় রাস্তাও দেখা যাচ্ছে না। বেলতলী আসতেই জঙ্গল থেকে এক পাগল দৌড়ে এসে ভ্যানগাড়িতে উঠে লাশের ওপর বসে পড়ে। সে কি মানুষ না ভূত এ নিয়ে ভরকে যাই। তখন ভয় পেয়েছিলাম। মুহূর্তেই শরীরের প্রতিটি পশমের গোড়ায় ঘাম ঝরছিল। সামনে একটি মনোহারী দোকান লাইট জ্বলতে দেখেই সেখানে গিয়ে গাড়ি থামাই। তখনো বুঝতে পারছিলাম না, সে কি মানুষ না ভূত! চা-বিস্কুট খাওয়ানোর পর সিগারেট দিলাম, ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরানোর পর বুঝলাম আসলে সে পাগল।
আরেক রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ভ্যান থেকে লাশ দাঁড়িয়ে গেছে। আমার শরীরে লাশের স্পর্শ পাচ্ছি। একা অন্ধকার সড়কে, কী করব ভাবছি! হঠাৎ শরীরের চাদরটা টান মেরে বুঝলাম, এতক্ষণ লাশ নয়, আমার শরীরের চাদরই এমন লাগছিল। এখন কোনো কিছুই ডর-ভয় নেই।
চিকিৎসকদের মৃত ঘোষণার পর দুটি শিশু জীবিত থাকার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে! এ ঘটনার পর থেকে লাশের ব্যাপারে আরও সচেতন এই বারেক। তিনি জানান, ভ্যান চালানোর সময় বারবার পেছনে ফিরে দেখেন লাশটা ঠিক আছে তো! গভীর রাতেও লাশ নিয়ে ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরেও একাকি যান।
লাশ উদ্ধারে বারেকের দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. কামরুল হাসান।
একটি লাশ পুড়ে বীভৎস। বলেশ্বর সেতুর নিচে পড়ে আছে, সকালে জেলেরা খবর দেয়। ব্রিজের চারপাশে ঘেরাও করে নাকে-মুখে রুমাল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সহস্র মানুষ। কচুরিপানা সরানোর সাহস হচ্ছে না কারও। পচা-দুর্গন্ধে পুলিশ কর্মকর্তারাও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন সময় এই বারেক এলেন। সহস্র মানুষের সামনে তাক লাগিয়ে পচাগলিত-পোড়া লাশটি উদ্ধার করে মুহূর্তেই ঢুকিয়ে দিলেন পুলিশের ময়নাতদন্তের লাশবহনকারী ব্যাগে। এখনো সেই লাশের পরিচয় মেলেনি। শুধু তাই নয় মাথাবিহীন, খণ্ড-বিখণ্ড, কাটা-ছেঁড়া, গলিত, পচা-দুর্গন্ধযুক্ত যেকোনো লাশ উদ্ধারে গৌরীপুর থানার একমাত্র ভরসা বারেক। ঝড়-বৃষ্টি, তুফানেও ওর পথচলা থেমে থাকে না।
সংবাদকর্মীদের তীক্ষ্ণদৃষ্টিও রয়েছে এই বারেকের দিকে! কেননা, বারেক বের হচ্ছে মানেই লাশের খবর!
কর্মের প্রতি বারেকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে কনস্টেবল আব্দুল কাদির জানান, সে শুধু লাশ বহন করে না। লাশ পাহারাও দেয়।
ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে দুর্ঘটনায় সন্ধ্যায় ৭ জন নিহত হন। ওই রাতে তাকে লাশ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেন ওসি। থানা কমপ্লেক্সের সামনেই সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছিল লাশের সারি। ডিউটি পরিবর্তনের সময় রাতের ডিউটিতে আসা কনস্টেবলকে ৭টি লাশ বুঝিয়ে দেন।
এদিকে বারেক রাতের খাবার খেয়ে লাশের সারিতে এসে সেই সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। মধ্যরাতে কনস্টেবল আব্দুর রহমান লাশ ৮টি দেখে বিপদ ঘণ্টা বাজিয়ে দেন। শুরু হয় চিৎকার, হৈ-হুল্লোড়। লাশ বেড়ে গেছে-খবর পেয়ে ওসিও ছুটি আসেন। তিনি সাদা কাপড় সরিয়ে দেখেন, লাশ বাড়েনি, বারেক শুয়ে ঘুমিয়ে আছে! লাশ নিয়ে বারেকের এমন অসংখ্য ঘটনা শুনলে ভৌতিক মনে হয়, যা সত্য!
জীবিকার তাগিদেই বারেক এ পেশা ছাড়তে পারছে না। ঘুমেও অসংখ্য লাশ টেনে চলেছেন, লাশের ভ্যানচালক বারেক! জীবনের শক্তি কমছে, বাড়ছে বয়স শুধু বাড়েনি আর্থিক সক্ষমতা।