ইউক্রেনে প্রায় চার বছর ধরে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে গাজা বিষয়ে একটি তথাকথিত ‘শান্তি পর্ষদে’ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে শান্তি আলোচনা কার্যত স্থবির থাকা অবস্থায় সোমবার এই আমন্ত্রেণের বিষয়টি প্রকাশ পায়।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, মস্কো এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাবটির ‘সব সূক্ষ্ম দিক স্পষ্ট’ করার চেষ্টা করছে।
‘শান্তি পর্ষদ’টির লক্ষ্য শুধু গাজার শাসন ও পুনর্গঠন তদারকি নয়, বরং বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনেও ভূমিকা রাখা।
‘‘শান্তি পর্ষদ’ ও ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের নেতাদের নিয়ে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ বা ‘শান্তি পর্ষদ’ গঠন করতে চান ট্রাম্প, যার সভাপতিত্ব করবেন তিনি নিজেই। এই বোর্ডের লক্ষ্য বৈশ্বিক সংঘাত নিরসন এবং গাজায় শাসন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারক করা।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ১৯ জানুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রেসিডেন্ট পুতিন এই ‘শান্তি পর্ষদে’ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন।”
তিনি জানান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাবটির ‘সব সূক্ষ্ম বিষয় স্পষ্ট’ করা হচ্ছে। তবে পুতিন এতে যোগ দিতে আগ্রহী কি না, সে বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোকেও এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ট্রাম্প।
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার অবস্থান বদল
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনসহ গুরুত্বপূর্ণ সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে মস্কো।
তবে গাজায় ইসরায়েলের দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা গণহত্যামূলক যুদ্ধ এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর এই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।
পুতিন প্রশাসন ইসরায়েল থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে ইরানের মতো তার বিরোধী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে।
একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টাও করেছে মস্কো।
ট্রাম্পের ভূমিকায় প্রশংসা পুতিনের
এর আগে ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন পুতিন। গত অক্টোবরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা জটিল সংকট সমাধানে ট্রাম্প সত্যিই সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গে পুতিন বলেছিলেন, “ডোনাল্ড যা অর্জনের চেষ্টা করছেন, তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেটি হবে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।”
গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক
ইসরায়েলে রুশ বংশোদ্ভূত মানুষের বড় একটি জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা পরিস্থিতি ইসরায়েল-রাশিয়ার ঐতিহ্যগত সুসম্পর্কে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
ক্রেমলিন বারবার গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে পুতিনের ২০২৫ এর মে মাসে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, “গাজা উপত্যকা প্রকৃত অর্থেই এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাছ্ছে।
“ফিলিস্তিনি জনগণের বন্ধু হিসেবে রাশিয়া নিয়মিত মানবিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।” —এ তথ্য নিশ্চিত করে রুশ বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তি।
ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এই ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ’ কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী এটি হবে তিন স্তরের একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আরব দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প নিজে, ইসরায়েলপন্থী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের শীর্ষস্তরে রাখা হলেও কেবল পৌর প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়ে ফিলিস্তিনিদের রাখা হয়েছে তৃতীয় স্তরে।
সমালোচকদের মতে, এতে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভূমিকা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং গাজায় এক ধরনের বাণিজ্যিক ও ‘নব্য উপনিবেশবাদী’ শাসনব্যবস্থার পথ তৈরি হতে পারে।