মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সুস্বাস্থ্য। সুস্থ থাকলেই আমরা কাজ করতে পারি, পরিবারকে সুখ দিতে পারি এবং সমাজকে এগিয়ে নিতে পারি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশে চিকিৎসা ব্যয় দিন দিন এমনভাবে বেড়ে যাচ্ছে যে সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছে না। অসুস্থ হলে যে ব্যয় বহন করতে হয়Ñ তা শুধু পরিবারকেই আর্থিকভাবে দুর্বল করে না, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নকেও ব্যাহত করে। তাই আজকের সময়ের দাবিÑ চিকিৎসা ব্যয় হোক সহজসাধ্য। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় খুবই সীমিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একজন নাগরিকের জন্য বছরে যে পরিমাণ খরচ সরকারের করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে তা এখনও অনেক কম। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সীমিতসংখ্যক সেবা পাওয়া গেলেও, ওষুধপত্র, টেস্ট এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রোগীদের অধিকাংশ সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে চিকিৎসার খরচ গরিব ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
চিকিৎসা ব্যয় কেন বাড়ছে তার কয়েকটি প্রধান কারণ হলো সরকারি হাসপাতালের সীমিত সুযোগ-সুবিধা। সরকারি হাসপাতালে সেবা থাকলেও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, ডাক্তার, নার্স ও বেডের সংকট থাকে। এতে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যায়, যেখানে খরচ কয়েকগুণ বেশি। অনেক ওষুধ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও, বিশেষ করে ক্যানসার, হার্ট ও কিডনির ওষুধগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে দাম বেড়ে যায়। তা ছাড়া অনেক ফার্মেসি অতিরিক্ত দামে ওষুধ বিক্রি করে। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের খরচে প্রতিদিনই নতুন নতুন টেস্টের নাম যুক্ত হচ্ছে। রোগ নির্ণয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলেও এর ব্যয় বহন করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ডাক্তার ও হাসপাতাল কমিশনভিত্তিক চিকিৎসা বা টেস্টে পাঠান, যার ফলে খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
চিকিৎসা ব্যয় সহজসাধ্য করতে হলে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
১. সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো : রাষ্ট্রকে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। প্রত্যেক উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দিতে হবে। চিকিৎসার মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হবে না।
২. ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ : সরকারি পর্যায়ে ওষুধের মূল্য তালিকা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একসঙ্গে সরকারি ফার্মেসি বা ডিসকাউন্ট ফার্মেসির সংখ্যা বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সঠিক দামে ওষুধ কিনতে পারে।
৩. ডায়াগনস্টিক টেস্টে নীতিমালা : প্রতিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টেস্টের নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করা দরকার। একই টেস্ট ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যে হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
৪. স্বাস্থ্য বীমার প্রসার : প্রত্যেক নাগরিকের জন্য কম খরচে স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। এতে যে কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচের বড় অংশ বীমা থেকে কভার হবে।
৫. প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর জোর দিতে হবে।
৬. কমিশন ব্যবসা বন্ধ : চিকিৎসা খাতে মধ্যস্বত্বভোগী ও কমিশন নির্ভর ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ডাক্তারদের নৈতিকতা এবং হাসপাতালের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. টেলিমেডিসিন সেবা : ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন টেলিমেডিসিন একটি বড় সম্ভাবনা। অনলাইনে ডাক্তার পরামর্শ দিলে রোগীরা অল্প খরচে চিকিৎসা পাবে, গ্রামাঞ্চলের মানুষও সহজে ডাক্তারি সেবা নিতে পারবে।
ইউরোপ, কানাডা কিংবা কিউবাÑ এসব দেশে নাগরিকদের চিকিৎসা প্রায় বিনামূল্যে। কারণ সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের দেশেও একইভাবে স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা নিতে হবে।
চিকিৎসা একটি মৌলিক মানবাধিকার। কোনো মানুষ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। আমরা যদি সরকারি স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করি, ওষুধ ও টেস্টের দাম নিয়ন্ত্রণ করি এবং স্বাস্থ্য বীমা চালু করি তাহলে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।