স্বাস্থ্যে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাপক রদবদল হচ্ছে

বাহাদুর ডেস্ক :

স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছে। পদত্যাগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আমিনুল হাসানকে সরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদলের চিন্তাভাবনা চলছে।

করোনা মহামারী শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই দেশের স্বাস্থ্য খাতের কঙ্কাল বেরিয়ে আসে। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য গণমাধ্যমে উঠে এলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে নেয়া হচ্ছে এ পদক্ষেপ।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে যে অনিয়ম, দুর্নীতি, অসঙ্গতি রয়েছে বা চলছে তা দূর করতে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। চিকিৎসক ও আমলাদের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে তা দূর করতে হবে। শুধু সচিব বা মহাপরিচালক পরিবর্তন করেই এ সংকটের সমাধান হবে না।

সমালোচনার শুরু হয়েছিল চিকিৎসকদের নিম্ন মানের মাস্ক সরবরাহ দিয়ে। নানা ঘটনার পর সর্বশেষ রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথ কেয়ারের জালিয়াতি ফাঁস হলে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। এ সময় মহাপরিচালক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানান, রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে।

এ মন্তব্যের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার কাছে ব্যাখ্যা চায়। দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আরও দু-তিন বছর থাকবে- এমন বক্তব্যের জন্যও মন্ত্রীদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে করোনা মোকাবেলায় নেয়া দুটি প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বলা হচ্ছে, ওই প্রকল্পে চশমা ও পিপিইর দাম বাজার মূল্যের কয়েকগুণ বেশি ধরা হয়েছে।

এ ঘটনার পর গত মাসে প্রকল্প পরিচালককে বদলি করে সরকার। নানা অভিযোগের ভিত্তিতে এর আগে স্বাস্থ্য সচিবসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার বিদায় নিতে হল আবুল কালাম আজাদকে।

মহাপরিচালক না থাকায় অধিদফতর কীভাবে চলছে জানতে চাইলে বুধবার অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর একটি বড় প্রতিষ্ঠান। কোনো এক বা দু’জন ব্যক্তি না থাকলে কাজের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

এ বিষয়ে বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘ডিজি (আবুল কালাম আজাদ) পদত্যাগ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী এটা জনপ্রশাসনে গেছে। জনপ্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী পদক্ষেপ তারা কী নেবে।’

নতুন ডিজি নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পদত্যাগপত্র যেটা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গেছে এ বিষয়ে আগে আমাদের কাছে সিদ্ধান্ত আসুক, তারপর আমরা চিন্তাভাবনা করে, আরও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারব। অবশ্যই সবাই মিলে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। দরকার হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।’ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্য অধিদফতরের আরও কিছু কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখব যেখানে প্রয়োজন পরিবর্তনের, সেখানে পরিবর্তন করা হবে। আমরা চাই এখানে সুষ্ঠু পরিচালনা হোক, মানুষ সেবা পাক।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, কয়েকজন অতিরিক্ত সচিবকেও এরই মধ্যে বদলি করা হয়েছে। কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহসহ বিভিন্ন স্তরের অন্তত ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে।

এছাড়া অতি গোপনে অধিদফতরের মধ্যম পর্যায়ের ১০ কর্মকর্তা বদলি করা হয়েছে। এখন পরিচালক পদমর্যাদার ১৫ থেকে ২০ কর্মকর্তার বদলির সিদ্ধান্ত বিবেচনাধীন রয়েছে মন্ত্রণালয়ে। শৃঙ্খলা ফেরাতে অধিদফতর ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সূত্র আরও জানায়, পরিচালক হাসপাতালের পাশাপাশি ওই শাখার লাইন ডিরেক্টর ও পরিচালক প্রশাসন এবং এ দুই শাখার বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা বদলির প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন পদে রদবদল হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. আবদুল হামিদ যুগান্তরকে বলেন, এটা আইসবার্গের চূড়া, স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন না করলে কোনো সমস্যা মিটবে না। শুধু স্বাস্থ্য নয়, কোনো মন্ত্রণালয়ে চেইন অব কমান্ড নেই। এর কারণ বেশিরভাগ নিয়োগ/পদায়ন হয় তদবিরে। উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত অবস্থানে না বসালে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না।

প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত লোক বসাতে হবে। এক্ষেত্রে হেলথ ক্যাডার সার্ভিস গঠন করা জরুরি। অর্থাৎ জুডিশিয়াল সার্ভিসের মতো করে হেলথ ক্যাডার সার্ভিস গঠন করতে হবে। পাশাপাশি মন্ত্রী থেকে শুরু করে সর্বস্তরে যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিতে হবে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, মহাপরিচালক পদত্যাগ করলেই যে অধিদফতরের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বিষয়টি তেমন নয়। যিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তাকে অবশ্যই অধিদফতরের সবার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে সমন্বয় থাকতে হবে। সব কাজে আন্তরিক হতে হবে। সব নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তাহলেই স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সরিয়ে দেয়া হচ্ছে হাসপাতাল পরিচালককে : অনুমোদনহীন হাসপাতাল রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আমিনুল হাসানের বিরুদ্ধে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পরিচালক বদলির ফাইলটি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ আমিনুল হাসানই ২১ মার্চ রিজেন্ট হাসপাতালের চুক্তি বিষয়ক চিঠিতে লেখেন, ‘সচিব স্যারের নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।’

ডিজির পদত্যাগপত্র গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বুধবার যুগান্তরকে বলেন, পদত্যাগপত্রটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছি আমরা। এখন রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে সম্মতি দিলেই মহাপরিচালক হিসেবে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের দায়িত্বের অবসান হবে। ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের দায়িত্বে বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক ডা. আজাদ।

সরকারি চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পরও (২০১৯ সালের ২৭ মার্চ) তাকে ওই পদে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সেই আদেশে বলা হয়েছিল, ১৫ এপ্রিল বা যোগদানের তারিখ থেকে ২ বছরের জন্য তিনি মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকবেন। সে হিসাবে, আগামী বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ ছিল।

আজাদ-নাসিমাকে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদ : পদত্যাগী মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, জেকেজি হেলথ কেয়ারকে অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে তাদের কাছ থেকে কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেকেজি কোন প্রক্রিয়ায় কাজ পেল তা খতিয়ে দেখতেই এ জিজ্ঞাসাবাদ। ডিবির লোকজন তাদের কার্যালয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কাগজপত্র পাওয়ার পর এ ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আক্কাস আলী শেখ বলেন, বিকাল সোয়া ৪টার দিকে ডিবির কর্মকর্তারা অফিসে আসেন। এ সময় তারা অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কক্ষে আধা ঘণ্টা অবস্থান করেন। এরপর তারা মহাপরিচালকের কক্ষ বন্ধ পেয়ে চলে যান।

ডিবি সূত্র জানায়, আবুল কালাম আজাদের কক্ষ বন্ধ পেয়ে ডিবি কর্মকর্তারা তার বাসায় যান। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত ৮টা) কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন। সূত্রমতে, জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছিলেন, তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী করোনার ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করছেন- এ বিষয়টি তিনি দুই দফায় মহাপরিচালককে জানিয়েছিলেন। মহাপরিচালক এ সময় তাকে চেপে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর সাবরিনা জেকেজি থেকে পদত্যাগ করেন। এসব বিষয়ে কিছু প্রমাণ পাওয়ার পর আবুল কালাম আজাদকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

টি.কে ওয়েভ-ইন