সোলেমানি হত্যার প্রতিশোধ মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলা

সোলেমানি হত্যার প্রতিশোধ মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলা ২২ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত ৮০ ও সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতি * ফের হামলা হলে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ : তেহরান

অনলাইন ডেস্ক :

ইরাকে দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে ৮০ মার্কিন সেনা নিহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সামরিক সরঞ্জামের। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের আইন আল আসাদ ও কুর্দিস্তানের ইরবিল ঘাঁটিতে ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে দাবি করা হয়- মঙ্গলবার শেষ রাতে হামলার মাধ্যমে কাসেম সোলেমানি হত্যার জবাব দেয়া হয়েছে। তবে এরপর ইরান আর যুদ্ধ চায় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা করে তবে পাল্টা জবাব দেবে। সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়ে এর জবাব দেবে ইরান। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনাদের বিতাড়িত করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে হুশিয়ার করে দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। এদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক টুইটে বলেছেন, ‘সব ঠিক আছে! এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, ভালো হয়েছে!’ ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। এ নিয়ে স্থানীয় সময় বুধবার সকালে বিবৃতি দেবেন বলেও তিনি টুইটারে উল্লেখ করেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগন এ হামলার কথা স্বীকার করলেও কোনো হতাহতের কথা জানায়নি। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, ‘মিসাইল হামলা আমেরিকার সৈন্যদের জন্য একটি চপেটাঘাত।’ এ অঞ্চল (মধ্যপ্রাচ্য) থেকে তিনি মার্কিন সেনাদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। রেভল্যুশনারি গার্ডের এক সিনিয়র অফিসার বলেছেন, ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলায় মার্কিন হেলিকপ্টার ও সামরিক যানেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১০০টি টার্গেট ঠিক করে রাখা হয়েছে। মার্কিনিরা আবার হামলা চালালে এসব লক্ষ্যবস্তুতে তাৎক্ষণিক আঘাত হানা হবে। বাগদাদের মার্কিন ঘাঁটিতে এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ব্যাপারে ইরান আগেই ইরাক সরকারকে জানিয়েছিল। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলছে, ইরাকে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। তবে ইরানে সামরিক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় উতাহ অঙ্গরাজ্যের ঘাঁটি থেকে ৫২টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মহড়া শুরু করেছে। খবর বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, রয়টার্সের।

সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বুধবার প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে হামলা চলে। ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১৭টি আল আসাদ বিমান ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। বাকি পাঁচটি উত্তরাঞ্চলীয় ইরবিলে আঘাত হানে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভয়ংকর প্রতিশোধ শুরু হয়েছে। নিজ শহরে সোলেমানির লাশ দাফনের কয়েক ঘণ্টা পর নিজ দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার খবর প্রচার করে। ইরানের পক্ষ থেকে হুশিয়ার করা হয়, এ হামলার জবাব দিলে আরও বড় ধরনের আক্রমণ হবে। এটি কোনো হুমকি নয়, এটা হুশিয়ারি।

ইরান টিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সোলেমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এ আক্রমণ করা হয়েছে। তাই এ অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে ‘অপারেশন শহীদ সোলেমানি’। প্রতিশোধ নেয়ার পর সোলেমানি এখন শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন। ৩ জানুয়ারি (শুক্রবার) যে সময় সোলেমানির ওপর মার্কিন ড্রোন হামলা চালানো হয়, ঠিক একই সময়ে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনির কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইরানি টেলিভিশন জানায়, এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল ‘সবচেয়ে দুর্বল’। নিজের শহর কেরমানে শহীদদের জন্য নির্ধারিত স্থানে ইরানের জাতীয় বীর সোলেমানিকে দাফন করা হয়েছে।

সোলেমানির হত্যার জেরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনাদের বিতাড়িত করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে হুশিয়ার করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। বুধবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি বলেন, তোমরা সোলেমানির দেহ থেকে তার হাত কেটে দিয়েছ, এ অঞ্চল থেকে তোমাদের পা কেটে ফেলা হবে।

হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ বলেছেন, ইরান আর যুদ্ধ বা উত্তেজনা চায় না। এক টুইটে তিনি বলেন, ‘আমাদের জনগণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর যে ঘাঁটি থেকে কাপুরুষোচিত সশস্ত্র হামলা করা হয়েছে, জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুসারে আত্মরক্ষায় ইরান সেখানে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে এর (ঘটনার) সমাপ্তি টেনেছে। ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে বৈধ আত্মরক্ষা আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘আমাদের পদক্ষেপ আত্মরক্ষার এক বৈধ কৌশল ছিল। আমরা যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়াতে চাই না, তবে যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করব।’ তিনি বলেন, হতাহতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কল্পনাপ্রসূত কোনো হিসাব দেয়া উচিত হবে না।

হামলার পর ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাকেরি বলেন, তার দেশ সক্ষমতার সামান্যই দেখিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এর প্রতিশোধ নেয় তাহলে আরও কঠিন ও বিধ্বংসী জবাব দেবে তেহরান। তিনি আরও বলেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের ইরানের ক্ষমতা অনুধাবন করা এবং দেশটির ‘সন্ত্রাসী সেনাদের’ এ অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সরকারের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়- ‘যুক্তরাষ্ট্রের সেই সব মিত্রকে সতর্ক করছি, যারা এ সন্ত্রাসী সেনাবাহিনীকে নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। যেসব অঞ্চল বা এলাকা থেকে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হবে সেগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে।’

পেন্টাগন থেকে ওই সময় জানানো হয়- হামলার ব্যাপারে জাতির উদ্দেশে ভাষণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, ‘রাতে আর ক্যামেরার সামনে আসবেন না তিনি।’ এদিকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপেরসহ শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউস ছেড়ে গেছেন। পেন্টাগনের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে ইরাকের দুটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে এক ডজনেরও বেশি ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল’ ছুড়েছে ইরান। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইরান থেকে ছোড়া হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগনের মুখপাত্র জনাথন হফম্যান বলেছেন, ইরাকের আল-আসাদ ও ইরবিল মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ওই অঞ্চলে মার্কিন সেনা, অংশীদার ও সহযোগীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে। এর আগে পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপের বলেন, যে কোনো উপায়ে বা আকারে ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে বলে তাদের ধারণা ছিল।

জার্মানি, ডেনমার্ক ও নরওয়ে জানিয়েছে- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের কোনো সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। জার্মানি জানায়, তাদের ১১৫ জনের মতো সেনা ইরবিলে রয়েছে। ডেনমার্ক জানায়, ইরাকে তাদের ১৩০ জনের মতো সেনা রয়েছে। আল-আসাদ ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের কোনো সেনা নিহত হয়নি বা আহতও হয়নি। নরওয়ে জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের কোনো সেনা হতাহত হয়নি। আল আসাদ ঘাঁটিতে তাদের ৭০ জনের মতো সেনা রয়েছে। ইরাকে পাঁচ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা রয়েছে।

যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেখানে ব্যাপকভাবে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী আবার হামলা থেকে বিরত থাকলে এবং ইরান সোলেমানি হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে আর কোনো পদক্ষেপ না নিলে এ সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার একটি সুযোগ পেতে পারে ওয়াশিংটন ও তেহরান।

আরব আমিরাত ও ইসরায়েলেও হামলার হুমকি ইরানের : ইরানের ভূমিতে হামলা হলে আরব আমিরাতের দুবাই ও ইসরাইলের হাইফা শহরে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরানের রেভন্যুশনারি গার্ড। নিজস্ব চ্যানেল টেলিগ্রামে সংস্থাটি বলেছে, ইরানে হামলা চালানোর ঘটনা ঘটলে প্রতিশোধমূলক হামলার তৃতীয় ধাক্কায় লক্ষ্যবস্তু থাকবে দুবাই ও হাইফা শহর। বুধবার সিএনএনের লাইভ আপডেটে এ তথ্য জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) বেসামরিক মার্কিন বিমানগুলোকে ইরাক, ইরান, পারস্য ও ওমান উপসাগরের ওপর চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।