পিচ্ছিল বিপদজ্জনক রাস্তা গাড়ী যাচ্ছে দোকানে-পুকুরে আর বাড়িতে

ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক এখন মৃত্যুকূপ! পিচ্ছিল বিপদজ্জনক রাস্তা গাড়ী যাচ্ছে দোকানে-পুকুরে আর বাড়িতে ॥ সড়ক অবরোধ

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি ঃ
ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুরের এক কিলোমিটার বিপদজ্জনক পিচ্ছিল রাস্তায় চলন্ত গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে দোকানে-পুকুরে আর বাড়িতে! ইটভাটার পরিত্যক্ত মাটি পুরো রাস্তাকে কর্দমাক্ত করে দিয়েছে। রামগোপালপুর বাসস্ট্যান্ডে মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি/২০২০) ট্রাকের চাপায় মাছচাষী রহমান খাঁন (৪৫) ঘটনাস্থলে নিহত হন। মাত্র এক কিলোমিটার এলাকায় একদিনে অর্ধশত গাড়ী নিয়ন্ত্রণ হারায়!
ঈশ^রগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মাহফুজুর রহমান জানান, ইটভাটাতে হ্যান্ডট্রলি দিয়ে মাটি নেয়ার সময় পরিত্যক্ত মাটি হঠাৎ বৃষ্টিতে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যায়। রামগোপালপুর বাসস্ট্যান্ডে বাস, সিএনজি, মোটর সাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারায়। দ্রুত গতির এসব গাড়ি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ করতে এসে আরো বিপদজ্জক পরিস্থতির শিকার হয়। কৈট্টাপুরি বিলের পাশে ইটভাটার মাটিতে পিচ্ছিল তাকায় ময়মনসিংহগামী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ পুকুরে পরে যায়।
এদিকে রামগোপালপুরের আক্কাছ আলী জানান, রামগোপালপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র এক কিলোমিটারে চারটি ইটভাটা। পুলিশ ও প্রশাসন মাইকিং করার পরেও এসব ভাটায় হ্যান্ডট্রলি দিয়ে মাটি আনা হচ্ছে। হ্যান্ডট্রলির পিছনের ঢাকনা না লাগানোর কারণে পুরো মহাসড়কের মাটি পড়ে। এখন কর্দমাক্ত। আর এ কারণেই রামগোপালপুর বাসস্ট্যান্ডে একদিনে কমপক্ষে ৫০টি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারায়। সিএনজি, মোটর সাইকেল, বাস-ট্রাক গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় দোকানপাটে চলে যাচ্ছিলো। পরিস্থিতির অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় রাস্তার দু’পাশের দোকানপাট ভয়ে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এরপর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মহাসড়ক দীর্ঘ সময় অবরোধ করে রাখেন।
অপরদিকে রাস্তা থেকে ইটভাটার মাটির কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল অংশ অপসারণ করতে ঈশ^রগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে রামগোপালপুর বাসস্ট্যান্ড মাটি দিয়ে ধৌত করা হয়। এরপরেও কৈট্টাপুরি, গাঁওরামগোপালপুর এলাকায় একটি বাস, ৬টি মোটর সাইকেল, ৪টি ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারাতে দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে গাঁওরামগোপালপুরের আক্কাছ আলী জানান, মহাসড়কে এখন মহা কর্দমাক্ত সড়কে পরিণত হওয়ার এ দুর্ঘটনার মূল কারণ। রামগোপালপুরের এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান এলাকাবাসী। তাদের দাবি শুধু রাস্তা নয়, এলাকার পরিবেশও বিনষ্ট করতে। এক কিলোমিটারে ৪টি ইটভাটা নয়, এ যেন ৪টি বিষের ফ্যাক্টরী এমনটাই দাবি করলেন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র মোঃ আশরাফ হোসেন।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে টমটম, নসিমন-করিমন, হ্যান্ডট্রলি মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মাইকিং করেন গৌরীপুর থানার অফিসার মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন। তিনি জানান, সকল যানবাহন সাবধানে চলাচল করার জন্যও নির্দেশনামূলক প্রচারপত্র সাঁটানো হয়েছে।
অপরদিকে সড়ক দুর্ঘটনা ও সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষ সংক্রান্ত জরুরী সভা ডেকেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেঁজুতি ধর। তিনিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বুধবার সভায় করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এদিকে ঈশ^রগঞ্জের ভূইয়া ফিলিং স্টেশনের পাশে ইটভাটার জন্য একই পরিস্থিতির শিকার হয় আরো ১০/১২টি যানবাহন বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঈশ^রগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মাহফুজুর রহমান।
এ দিকে মেধাবী ছাত্রী তিথি পাল। ট্রাক চাপায় মারা যায়। আহত বান্ধুবী রূপা বাঁচার জন্য লড়ছে। এ দুর্ঘটনার প্রতিবাদ আর বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয় ময়মনসিংহের গৌরীপুর। এক মাসে তিথির মতো আরো ১০টি তাজাপ্রাণ ঝড়ে গেলো। অস্থির সড়কে, স্বস্তি নেই! আন্দোলনকারীদের দেয়া ১৪দফা দাবি, এখনও কাগুজে সীমাবন্ধ রয়েছে।
জানা যায়, উপজেলার পাটবাজারে কোচিংয়ে যাওয়ার পথে ১৩ জানুয়ারি বালু বোঝাই ট্রাকের চাকায় পিস্ট হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায় তিথি পাল (১৩)। সে মধ্যবাজার চাল মহালের রঞ্জন পাল মনা’র কন্যা। এ সময় গুরুত্বর আহত হয় তিথি পালের বান্ধুবী রূপা চক্রবর্তী। সে কালিখলা শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্র‏‏‏‏হ্মচারী মন্দিরের কর্তা উত্তম চক্রবর্তীর কন্যা। তার বাড়ি নেত্রকোনার সুসংদুর্গাপুরে। ১৭ ফেব্রুয়ারি গৌরীপুর-রামগোপালপুর সড়কের বাহাদুপুর এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোঃ মোজাম্মেল হক (৩৫) নিহত হন। তিনি পূর্বধলা উপজেলার শ্যামগঞ্জ মানিকদির দারুল উলুম বাবুসালাম মাদরাসার প্রধান। তিনি ঈশ^রগঞ্জ উপজেলার চরআলগী গ্রামের মৃত আবেদ আলীর পুত্র। ১৬ ফেব্রুয়ারি গৌরীপুর-কলতাপাড়া সড়কের মোটরসাইকলে তিন বন্ধু ঘুরতে গিয়ে গৌরীপুর সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মামুন মিয়া নিহত হন।
অপরদিকে উপজেলার গাঁওরামগোপালপুর এলাকায় ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মাইক্রোবাস আর মাহেন্দ্র গাড়ীর মুখোমুখি সংঘর্ষে ১১জন আহত হন। আহতরা হলেন ঈশ^রগঞ্জ উপজেলার পস্তারী গ্রামের মোঃ আজিম উদ্দিনের পুত্র মোঃ আলমগীর (৩৫), মোঃ আবুল কাসেমের পুত্র মোঃ আল মামুন (৩০), শ্রীপুর জিতরের মৃত শাবদুল মোড়লের পুত্র মোঃ আবুল কালাম (৪০), ধরপঁচাশি গ্রামের আবুল সিদ্দিকের পুত্র মোঃ সাগর মিয়া (৫০), আবু সিদ্দিক ভূইয়ার পুত্র আব্দুস সাত্তার (৫০), দত্তপাড়ার সুজন মিয়া (৪০), রফিকুল ইসলাম রফিক (৪৫), গাঁওরামগোপালপুর গ্রামের মোঃ আব্দুর কাদিরের কন্যা মোছাঃ পপি আক্তার (২২), ফুলপুর উপজেলার চনপলাশিয়া গ্রামের আক্কাস আলীর পুত্র শুক্রর মাহমুদ (২৫), তার ভাই শামীম মাহমুদ (৩০) ও অজ্ঞাতনামা একজন।
এ দিকে বাবা-দাদীসহ ৪জনকে সড়কে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ২৯ জানুয়ারি। বিচার চেয়ে গৌরীপুর থানায় ওই দিনেই নিহত লাল মিয়ার পুত্র মোঃ খোকন মিয়া বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের চরশ্রীরামপুর এলাকায় খোকনের দাদী রাবেয়া খাতুন (৬৮), তার বাবা লাল মিয়া (৪৯), জেঠী সাহারা বানু (৭০) ও অটোরিকশা চালক রফিকুল ইসলাম (৫০) নিহত হন। এছাড়াও শ্যামগঞ্জ ও নেত্রকোণার পূর্বধলা সড়কের মহিষবেড় এলাকায় দু’ট্রাকের প্রতিযোগিতায় পিষ্ট হয়ে জুয়েল মিয়া (২৫) নামের এক যুবক নিহত হন। ১৫জানুয়ারি সন্ধ্যায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত যুবক গোয়ালাকান্দা ইউনিয়নের শালদিঘা গ্রামের জামির হোসেনের পুত্র।
অপরদিকে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে উপজেলার রামগোপালপুর এলাকায় ১৫ জানুয়ারি ট্রাক চাপায় দুই মোটর সাইকেল আরোহী গুরুতর আহত হয়। তাদেরকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ময়মনসিংহে নেয়ার পর মারা যান। একই সড়কের শিবপুর পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সিএনজি চাপায় মইজ উদ্দিন (১১২) নিহত হন। তার বাড়ি রামগোপালপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামে। গৌরীপুর-শাহগঞ্জ সড়কে পৌর শহরের পুর্বদাপুনিয়ার রিকশা চালক মোহাম্মদ আলী (৪৮) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা নিহত হন।