নেত্রকোণায় নৌকাডুবিতে নিহত ১৮ জনের দাফন ময়মনসিংহ সদর ও গৌরীপুরে : চলছে শোকের মাতম

এম এ আজিজ, স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ ॥

নেত্রকোনার মদনের উচিতপুর হাওরে ভ্রমণে গিয়ে নৌকাডুবিতে নিহত ১৮ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬আগস্ট) সকালে ময়মনসিংহ সদরের সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়ায় ১২ জনকে, চরগোবিন্দপুরে একজন, চরখরিচায় দুইজন এবং গৌরীপুরের ধোপাজাঙ্গালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পিতা-পুত্রের নামাজে জানাযা সম্পন্ন হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিছ আলীর দানকৃত গোরস্তানের জমিতে (শহীদি গোরস্তান) ৯জনের দাফন সম্পন্ন হয়। বাকিদের পারিবারিক কবরস্থানের দাফন হয়। মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে নিহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক তাৎক্ষনিক প্রতি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা এবং জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় ও ময়মনসিংহ সদর আসনের এমপি নেতা বেগম রওশন এরশাদ নিহতের প্রতি পরিবারকে নগদ ৫ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করেন।

এলাকাবাসিরা জানান, সদর উপজেলার চরখরিচা কোনাপাড়া বাজারস্থ মাদরাসায়ে মারকাযুস সুন্নাহ’র মুহতামিম মাওলানা মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে কোনাপাড়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি সমিতির মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ ৪৮ জনকে নিয়ে গত ৫ আগষ্ট নেত্রকোনার মদনের পর্যটন খ্যাত ‘মিনি কক্সবাজার’ উচিতপুরে জামিয়া আজিজিয়া মঈনউল ইসলাম মাদ্রাসার আমন্ত্রণে বেড়াতে যান শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ ৪৮ জনের একটি দল। দুপুরে উচিতপুর পৌঁছে হাওরে ভ্রমণের জন্য ঘাট ছাড়ার পরই হাওরে ডুবে যায় ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি। খবর পেয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। একে একে উদ্ধার হয় ১৭টি মরদেহ। তাদের মধ্যে হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান, তার দুই ছেলে, দুই ভাতিজা-ভাতিজি ও ভাগ্নেসহ একই পরিবারের আটজনের প্রাণ গেছে।
এসময় নিহতদের স্বজনসহ উপস্থিত হাজারো মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ ও চোখের পানিতে ভারী হয়ে উঠে জানাযাস্থল। একসাথে এতো মৃত্যুর ঘটনা কোনোভাবেই তারা যেন মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা বলছেন, একসঙ্গে এত মানুষের জানাজা একসাথে পড়তে হবে এটা কল্পনার বাইরে।
কোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, কী বলব। সবাই একসাথে হাওরে গিয়েছিলেন আনন্দ করতে। কী হয়ে গেল বুঝতে পারছি না। প্রিয় মানুষগুলো এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে কখনো ভাবিনি। একসাথে এতো লাশ এর আগে দেখেনি গ্রামবাসী। আকস্মিক এ ঘটনায় শোকে মুহ্যমান নিহতদের স্বজনরা। খবর শোনার পর বুধবার বিকেল থেকেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে সবাই শুধু কান্না করছে। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা কারও নেই।

নিহতরা হলেন- ‘মাদরাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহ’র মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান (৪৫), তার দুই ছেলে হাফেজ মাহবুবুর রহমান আসিফ (১৫) ও মাহমুদুর রহমান (১২), ভাগ্নে রেজাউল করিম (১৫), ভাতিজা জোবায়ের (২০) ও জোনায়েদ (১৭), ভাতিজি লুবনা (১৩) ও জুলফা (৭), চরখরিচা গ্রামের কৃষক ইসা মিয়া (৪০) ও তার ছেলে শামীম (১০), কোনাপাড়া গ্রামের মাদরাসা শিক্ষক আজাহারুল ইসলাম (৩৮), হামিদুল (৩৫), সাইফুল ইসলাম রতন (৩০) ও জহিরুল ইসলাম (৩৫), চরগোবিন্দপুরের তালেব মেম্বারের ছেলে শহিদুল (৪০) এবং গৌরীপুর উপজেলার ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে শফিকুর রহমান (৪০) ও তার ছেলে সামাআন (১০)।
এদিকে, নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ থাকা রাকিবুল ইসলামের (২২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে ওই হাওরের রাজালীকান্দা এলাকায় রাকিবুলের মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে মদন থানা পুলিশ। রাকিবুল ময়মনসিংহ সদরের সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে এবং নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার তেলীগাতী মঈনুল ইসলাম মাদরাসার শিক্ষক। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জন।
এদিকে ট্রলারডুবিতে কোণাপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিছ আলীর ছেলে দেলোয়ার হোসেনও মারা যাওয়ায় রাতেই তিনি গোরস্তানের জন্য কোণাপাড়া বাজার সংলগ্ন সাড়ে আটাইশ শতাংশ জমি দানের ঘোষণা দেন।এই গোরস্থানেই ইদ্রিছ আলীর ছেলে দেলোয়ারসহ ৯ জনকে দাফন করা হয়। তিনি এই গোরস্থানের নামকরণ করেন শহীদি গোরস্থান।
নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) একেএম মনিরুল ইসলাম জানান, ময়মনসিংহ সদরের চরসিরতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। চরসিরতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সায়িদ জানান, খবর পেয়েই তিনি ঘটনাস্থলের গিয়ে লাশগুলো গ্রহন করেন এবং রাতেই লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আহমার উজজ্জামান জানান, করোনা মহামারিতে শিক্ষকদের ভ্রমন করার প্রোগ্রাম করা উচিত হয়নি। খামখেয়ালিপনার কারনেই এতগুলো মানুষের প্রাণ ঝড়ে গেলো।

টি.কে ওয়েভ-ইন