দেশজুড়ে আলোচিত স্কুলছাত্রী তিথি পাল হত্যাকান্ডের এক বছর আজ!

চালক ও হেলপাড়ের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডের চার্জশিট দায়ের : গৌরীপুরে থামেনি মৃত্যুর মিছিল

মোস্তাফিজুর রহমান বুরহান ও মোখলেছুর রহমান :

কোচিংয়ে যাওয়ার পথে রাস্তা থেকে প্রায় ৫ফুট দূরে গিয়ে দ্রুতগামী ট্রাকটির চাপায় পিইসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত তিথি পাল পিষ্ঠ হয়। হত্যাকান্ডের পরপরেই বিচার চেয়ে গৌরীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও নানা আন্দোলনে গৌরীপুর অচল হয়ে পড়ে। শুধু গৌরীপুর নয়, এ হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, ভৈরব ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। হত্যাকান্ডের এক বছর আজ বুধবার (১৩ জানুয়ারি/২০২১)।
মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি/২০২১) গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ বোরহান উদ্দিন জানান, এ হত্যাকাÐের ঘটনায় গৌরীপুর থানা পুলিশ ট্রাকের চালক নান্দাইল উপজেলার আগ মুসল্লী গ্রামের আঃ জব্বারের পুত্র মোঃ হুমায়ুন (৩২) ও ট্রাকের হেলপার একই উপজেলার আচারগাঁও গ্রামের আবুল হকের পুত্র মোঃ রবিন মিয়া (২২) এর ২৭৯, ৩০৪ (খ), ৩৩৮ (ক) ও ১০৯ পেনাল কোডের ১৮৬০ ধারায় চার্জশীট প্রদান করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রত্যেক এলাকায় বিটপুলিশিং কার্যক্রম করা হচ্ছে। মঙ্গলবার ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের কলতাপাড়া ও ডৌহাখলা বাজারে সচেতনতামূলক এ কর্মসূচী পালন করা হয়।


এদিকে মঙ্গলবার তিথিপালের মধ্যবাজারের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তিথির পড়ার টেবিল সুসজ্জিত বইগুলো পড়ে আছে। তার কাপড়গুলোও নিয়মিত পরিস্কার করে রাখছেন তার মা রীতা পাল। হত্যাকাÐের বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষুব্দ নিহতের বাবা রঞ্জন কুমার পাল। তিনি বলেন, চার্জশিট দিয়েছে তারপরেও শুধু তারিখ পড়ে মামলার, চালক আর হেলপাড় সবাই জামিনে রয়েছে। এ ঘটনায় আহত তিথির বান্ধুবী রূপা চক্রবর্তী উঠে দাঁড়িয়েছে সবেমাত্র। তার চিকিৎসা চলছে, পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে এখন ফিরতে পারেনি। সে কালিখলা শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্র‏‏‏‏হ্মচারী মন্দিরের কর্তা উত্তম চক্রবর্তীর কন্যা। তার বাড়ি নেত্রকোনার সুসংদুর্গাপুরে।
তিথি পালের মৃত্যু নিয়ে শুরু হয় ২০২০ গৌরীপুর। শিক্ষার্থীদের কড়া আন্দোলনের মুখে বন্ধ হয় বালুবাহী ট্রাক। তবে আন্দোলনকারীদের দেয়া ১৪দফা দাবি, এখনও কাগুজে সীমাবদ্ধ, এক দফাও বাস্তবায়িত হয়নি। অস্থির সড়কে স্বস্তি নেই, যোগ হয় সে বছর লাশের মিছিল!
আনন্দভ্রমণে গিয়ে ৪ পরীক্ষার্থী, বয়স্কভাতার কার্ড নিতে এসে একই পরিবারের ৪জন, নৌকা ভ্রমণে গিয়ে ১৮জনের প্রাণহানি, পৃথক ঘটনায় ৫জন কলেজ শিক্ষার্থী, ২জন এনজিও কর্মকর্তা, ট্রাকের ধাক্কায় বৃদ্ধার মৃত্যুসহ বছরজুড়ে সড়ক পথ, রেলপথ ও পানি পথে ছিলো মৃত্যুর মিছিল। প্রাণহানি বেড়েছে, রেলপথেও মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণহীন চালক ও যানবাহন, পানি পথেও নেই কোন শৃঙ্খলা আর অশৃঙ্খল রেলপথে গেইটম্যান না থাকায় এ মৃত্যু থামছেই না মন্তব্য করেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন গৌরীপুর উপজেলা শাখার সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ।
জানা যায়, ১৫ জানুয়ারি শ্যামগঞ্জ ও নেত্রকোণার পূর্বধলা সড়কের মহিষবেড় এলাকায় দু’ট্রাকের প্রতিযোগিতায় পিষ্ট হয়ে জুয়েল মিয়া (২৫) নামের এক যুবক নিহত হন। নিহত যুবক গোয়ালাকান্দা ইউনিয়নের শালদিঘা গ্রামের জামির হোসেনের পুত্র। একই দিনে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে উপজেলার রামগোপালপুর ট্রাক চাপায় দুই মোটর সাইকেল আরোহী গুরুতর আহত হয়। তাদেরকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ময়মনসিংহে নেয়ার পর মারা যান। একই সড়কের শিবপুর পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সিএনজি চাপায় মইজ উদ্দিন (১১২) নিহত হন। তার বাড়ি রামগোপালপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামে। গৌরীপুর-শাহগঞ্জ সড়কে পৌর শহরের পুর্বদাপুনিয়ার রিকশা চালক মোহাম্মদ আলী (৪৮) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা নিহত হন। ২৯ জানুয়ারি একই পরিবারের ৪জন নিহত হন। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের চরশ্রীরামপুর এলাকায় খোকনের দাদী রাবেয়া খাতুন (৬৮), তার বাবা লাল মিয়া (৪৯), জেঠী সাহারা বানু (৭০) ও অটোরিকশা চালক রফিকুল ইসলাম (৫০) নিহত হন। ৩০ জানুয়ারি উপজেলার গাঁওরামগোপালপুর এলাকায় মাইক্রোবাস আর মাহেন্দ্র গাড়ীর মুখোমুখি সংঘর্ষে ১১জন আহত হন। আহতরা হলেন ঈশ^রগঞ্জ উপজেলার পস্তারী গ্রামের মোঃ আজিম উদ্দিনের পুত্র মোঃ আলমগীর (৩৫), মোঃ আবুল কাসেমের পুত্র মোঃ আল মামুন (৩০), শ্রীপুর জিতরের মৃত শাবদুল মোড়লের পুত্র মোঃ আবুল কালাম (৪০), ধরপঁচাশি গ্রামের আবুল সিদ্দিকের পুত্র মোঃ সাগর মিয়া (৫০), আবু সিদ্দিক ভূইয়ার পুত্র আব্দুস সাত্তার (৫০), দত্তপাড়ার সুজন মিয়া (৪০), রফিকুল ইসলাম রফিক (৪৫), গাঁওরামগোপালপুর গ্রামের মোঃ আব্দুর কাদিরের কন্যা মোছাঃ পপি আক্তার (২২), ফুলপুর উপজেলার চনপলাশিয়া গ্রামের আক্কাস আলীর পুত্র শুক্রর মাহমুদ (২৫), তার ভাই শামীম মাহমুদ (৩০) ও অজ্ঞাতনামা একজন। ১৭ ফেব্রæয়ারি গৌরীপুর-রামগোপালপুর সড়কের বাহাদুপুর এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোঃ মোজাম্মেল হক (৩৫) নিহত হন। তিনি পূর্বধলা উপজেলার শ্যামগঞ্জ মানিকদির দারুল উলুম বাবুসালাম মাদরাসার প্রধান। তিনি ঈশ^রগঞ্জ উপজেলার চরআলগী গ্রামের মৃত আবেদ আলীর পুত্র। ১৬ ফেব্রæয়ারি গৌরীপুর-কলতাপাড়া সড়কের মোটরসাইকলে তিন বন্ধু ঘুরতে গিয়ে গৌরীপুর সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মামুন মিয়া নিহত হন।
অপরদিকে ১৭ ফেব্রæয়ারি গৌরীপুর-রামগোপালপুর সড়কের পূর্বদাপুনিয়া এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোঃ মোজাম্মেল হক (৩৫) নিহত হন। তিনি পূর্বধলা উপজেলার শ্যামগঞ্জ মানিকদির দারুল উলুম বাবুসালাম মাদরাসার প্রধান। একই দিনে গৌরীপুর-কলতাপাড়া সড়কের তাঁতকুড়া এলাকায় প্রাইভেটকারের সঙ্গে মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে গৌরীপুর সরকারি কলেজের মানবিক শাখার এইচএসসি পরীক্ষার্থী মামুন মিয়া নিহত হন। ১মার্চ আনন্দ-উৎসব করতে গিয়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ৪ শিক্ষাথী নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার কাকউরগড়া ইউনিয়নের শান্তিপুরে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। নিহতরা হলেন গৌরীপুর উপজেলার শালীহর হাজী আমির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্র রাকিবুল ইসলাম হৃদয় (১৪)। সে শালীহর গ্রামের রমজান আলী খানের পুত্র। গতবছর জেএসসির শিক্ষার্থী মোঃ আশরাফুল আলম (১২)। সে শালীহর গ্রামের আব্দুল হকের পুত্র। মাদরাসায় অধ্যয়রত শিক্ষার্থী ইয়াসিন মিয়া (১০)। সে মৃত আব্দুল মজিদের পুত্র। অপরজন হলেন তারাকান্দা উপজেলার বিসকা গ্রামের ছমির উদ্দিনের পুত্র সাহাবুল ইসলাম (১৬)। সে এবার শালীহর এ.মোতালেব বেগ দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়।
এদিকে ২৮ মে গৌরীপুর-কলতাপাড়া সড়কের গুজিখাঁয় ট্রাকের সাইকেল আরোগী রিপন মিয়া (১৬) নিহত হন। সে উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের পাঠানপাড়া গ্রামের আব্দুল সেলিমের ছেলে। ২৭ জুন ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কের গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর বাসস্ট্যান্ডে দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন ট্রাকের চালক ইছহাক আলী (ক্যাপ্টেন) (২৮)। তিনি শেরপুর জেলা সদর থানার কাঠুরিয়া কমুড়ী গ্রামের মৃত নুর মোহাম্মদের পুত্র। ২০ মে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের বড়ইতলা নামক স্থানে রাতে সিএনজি ও মোটর সাইকেলের সংঘর্ষে চাঁদপুরের সাজেদা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা মোঃ সেলিম মিয়া নিহত হন। তিনি জামালপুর জেলার মেলান্দহ থানার পাছপয়লা গ্রামের মোঃ নুরুজ্জামানের পুত্র। ৫ আগস্ট পর্যটনকেন্দ্র মিনি কক্সবাজার খ্যাত মদনের উচিতপুরে নৌকা ডুবিতে গৌরীপুরের পিতা শফিকুল ইসলাম ও তার বড় ছেলে ধোপাজাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র মুসায়েব সামান আম্মার নিহত হন। এ ঘটনায় প্রাণ হারান ময়মনসিংহের একই পরিবারের ৭ জন তারা হলেন- হাফেজ মাহফুজুর রহমান, ছেলে আশিফ, মাহমুদ মিয়া, ভাতিজি জুলফা, লুবনা, ভাতিজা জুবায়ের ও মোজাহিদ। এছাড়া সাইফুল ইসলাম রতন, জাহিদ, শামীম হাসান, শফিকুল, শহিদুল, ইসা মিয়া, আজহারুল, সামাআন, রেজাউল করিম, হামিদুল মারা যান।
অপরদিকে ২০ ডিসেম্বর নেত্রকোণা-ময়মনসিংহ সড়কের বেলতলীতে ট্রাক-সিএনজি মুখোমুখি সংঘষে ঘটনাস্থলে ৩জন নিহত হন। নিহতরা হলেন নিহতরা হলেন নেত্রকোণা জেলার দূর্গাপুর উপজেলার ইন্দুপুর গ্রামের আবুল মুনসুরের ছেলে মনির হোসেন (১৭), মিনকিকান্দা গ্রামের মৃত জনাব আলীর পুত্র মূল হক (৪৮), কলমাকান্দা উপজেলার গৌরীপুর গ্রামের মৃত আমিরুল ইসলামের পুত্র জাহাঙ্গীর হোসেন (৩৮)। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুরে ট্রাকের চাপায় মাছচাষী রহমান খাঁন (৪৫) ঘটনাস্থলে নিহত হন। ১২ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ-জারিয়া রেলপথের পূর্বধলা উপজেলার ঝিনাইকান্দি এলাকায় শুক্রবার বিকালে চলন্ত ট্রেনের সাথে ধাক্কায় পঞ্চাশোর্ধ এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের ময়মনসিংহ কোতয়ালীর পুলিয়ামারি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় গৌরীপুর সরকারি কলেজ ডিগ্রী ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নিহত হন। ৬ ডিসেম্বর গৌরীপুর-শ্যামগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কে ট্রাকচাপায় মোঃ সেলিম নামে এক দিন মজুর নিহত হন।

Print Friendly, PDF & Email