দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের আওতায় আসছে

বাহাদুর ডেস্ক:

আগামীতে দুর্বল ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘পুনর্গঠন’ পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা হবে। এর আওতায় প্রয়োজনমতো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ‘অবসায়ন’ বা ‘একত্রীকরণ’ করা হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে গঠন করা হবে একটি ‘স্থায়ী কমিটি’।

এই অবসায়ন বা একত্রীকরণ প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে মেনে চলতে হবে। পুনগর্ঠন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংককে বেশ কয়েকটি ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ ব্যাংকে, পুনগর্ঠন আওতায় থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক মোটা দাগের তিনটি কাজ করতে পারবে না।

এগুলো হলো- বাংলাদেশ ব্যাংকের লিখিত পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে নতুন কোনো ব্যাংক-ব্যবসায় নিয়োজিত হতে বা সম্প্রসারণ করতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের লিখিত পূর্বানুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত বার্ষিক ভিত্তিতে তার ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণ বা অগ্রিম) বৃদ্ধি করতে পারবে না এবং নগদ মুনাফা বণ্টনও করতে পারবে না।

তবে স্টক ডিভিডেন্ড, রাইট শেয়ার প্রদানে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়া গৃহীত বা গৃহীতব্য আমানতের ওপর বিদ্যমান বাজার হারের অতিরিক্ত সুদ বা মুনাফাও প্রদান করতে পারবে না। গুরুতর সঙ্কটাপন্ন ব্যাংক নতুন করে আমানতও সংগ্রহ করতে পারবে না।

বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এ ‘দুর্বল ব্যাংক-কোম্পানি ব্যবস্থাপনা’-শীর্ষক নতুন একটি অধ্যায়ে এই বিষয়গুলো সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে দুর্বল ব্যাংক কোম্পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের আওতায় এর পুনর্গঠন, একত্রীকরণ, অধিগ্রহণ ও অবসায়নের বিষয়ে বিদ্যমান পঞ্চম ও ষষ্ঠ খণ্ডকে একসাথে নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে বিষয়বস্তু ‘ব্যাংক কোম্পানি অধিগ্রহণ’ এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু ‘ব্যাংক কোম্পানির ব্যবসায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা ও অবসায়ন’।
বলা হয়েছে, ‘এই অধ্যায়ের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কোনো আদেশের ফলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের কাছে আপিল করতে পারবে এবং এ ক্ষেত্রে ওই পর্ষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। এই অধ্যায়ের অধীনে গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, আদেশ বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপ কোনো প্রকার প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না। অনুরূপ কোনো ব্যবস্থা আদেশ বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপরে সমে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না।’

ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়ার ওপর ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামতের ভিত্তিতে বিদ্যমান আইনটি সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হবে বলে জানা গেছে।

এই আইনের দুর্বল ব্যাংক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিশেষ বিধানে বলা হয়েছে,‘ যদি কোনো ব্যাংক কোম্পানি এরূপ বিবেচনা করে যে, এই ব্যাংক কোম্পানির বিদ্যমান আর্থিক অবস্থা অর্থাৎ, এর তারল্য, সম্পদের গুণগত মান ও মূলধন পরিস্থিতি এরূপ অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণে, হারে ও পন্থায় তারল্য, সম্পদ ও মূলধন সংরক্ষণ করা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কোম্পানির পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না বা হবে না এবং তার দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা দুরূহ অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে এই অবস্থা অচিরেই ব্যাংক কোম্পানিটিকে আরও সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে উপনীত করতে পারে, তা হলে এই ব্যাংক কোম্পানি অবিলম্বে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করবে।

পুনগর্ঠনের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুনর্নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারবে না। ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে কোনো লেনদেন বা সম্পদ হস্তান্তর করতে পারবে না। কোনো ব্যাংক থেকে কোনো আমানত গ্রহণ বা গৃহীত মেয়াদি আমানতের নবায়ন বা মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারবেন না। গুরুতর সঙ্কটাপন্ন ব্যাংক নতুন করে কোনো আমানত গ্রহণ করতে পারবে না।

আইনের অধীনে একটি স্থায়ী কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘(১) এই অধ্যায়ের অধীন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক- কোম্পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে এর পুনর্গঠন বা একত্রীকরণ কিংবা অধিগ্রহণ কিংবা অবসায়ন অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ও কর্মপন্থার বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক স্থায়ী কমিটি গঠন করবে।

(২) এই অধ্যায়ের অধীন গৃহীতব্য কার্যক্রমের কারণে বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা বিরূপ প্রভাব এবং দেশের আর্থিক খাতের সম্ভাব্য সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনান্তে উপ-ধারা (১) এর অধীনে গঠিত কমিটি সুপারিশ প্রদান করবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক- কোম্পানির বিষয়ে নিন্মোক্ত যেকোনো এক বা একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেব :

(ক) ব্যাংক-কোম্পানির ব্যবসা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা (মোরাটরিয়াম);
(খ) ব্যাংক-কোম্পানির পুনর্গঠন ;
(গ) অন্য কোন ব্যাংক-কোম্পানির সাথে একত্রীকরণ (মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজেশন);
(ঘ) অন্য ব্যাংক-কোম্পানির কাছে সম্পদ বিক্রয় এবং তৎকর্তৃক দায় গ্রহণ ;
(ঙ) অবসায়ন (লিক্যুডাইটেশন)

ব্যাংক-কোম্পানির ব্যবসা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আদেশ আইনে বলা হয়েছে, ‘(১) ধারা ৫৯ এর অধীন স্থায়ী কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যাংক-কোম্পানির সামগ্রিক আর্থিক এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাগত অবস্থা বিবেচনা করে আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন বা কোনো চুক্তি বা অন্য কোনো দলিলে যাই থাকুক না কেন, জনস্বার্থে বা আমানতকারীদের স্বার্থে, বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পরিচালক পর্ষদের অনুমোদন গ্রহণপূর্বক সংশ্লিষ্ট ব্যাংক-কোম্পানির ব্যবসা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আদেশ প্রদান করার লক্ষ্যে, অনধিক ছয় মাস সময়ের জন্য সেইরূপ আদেশ প্রদান করতে পারবে।

তবে শর্ত থাকে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক সেই মেয়াদ অনধিক আরও ছয় মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারবে।’

বাহাদুর.কম/এএ