গৌরীপুরে কবরে লাশ চুরির ঘটনায় আড়াই বছরেও প্রতিকার পায়নি স্বজনরা!

প্রধান প্রতিবেদক :
প্রিয়জনের লাশের সন্ধানে, চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কবরে লাশ নেই; এ খবর ছড়িয়ে পড়ায় ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নে তোলপাড় শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। মাত্র দুই-আড়াই ফুট ফাঁক করে অভিনব পদ্ধতিতে একের পর এক কবরের লাশ (কংকাল) চুরির ঘটনায় গ্রামবাসী হতবাক।

সেই থেকে এখন পর্যন্ত প্রিয়জন মৃত্যুর পর ‘লাশ রক্ষা’য় পাহাড়া দিচ্ছেন গ্রামবাসী। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার আড়াই বছরে পায়নি স্বজনরা। রোববার (১৫ নভেম্বর/২০২০) এবার ময়মনসিংহে বিশাল কঙ্কাল প্রাপ্তির খবরে গ্রামবাসী প্রিয়জনের লাশ দেখতে কবরে ছুটছেন!
এদিকে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ মোঃ শাহ কামাল আকন্দ জানান, ময়মনসিংহের কঙ্কাল পাচারচক্রের সঙ্গে গৌরীপুরের কবরে লাশ চুরির লিংক রয়েছে। ওরাও এ চক্রের সদস্য। ওদের বিরুদ্ধে সনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

যেভাবে লাশ চুরির খবর ফাঁস : ২০১৮সালের মার্চ মাসে লাশ বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা আকির হোসেন, রাসেল মিয়া আর হযরত আলী নামে তিনজন ময়মনসিংহে বিবাদ সৃষ্টি হয়। এ চক্রের সদস্যদের দ্বন্দ্বের কারণেই লাশ চুরির ঘটনা ফাঁস হয় ময়মনসিংহে। ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সেখানে এ ঘটনা শোনতে পান ভাংনামারী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলামের পুত্র নয়ন মিয়া। এ চক্রের ৩জনের বাড়িই তার এলাকায়। তাই তিনি বাড়িতে তার ভাই ফয়সাল ইসলামকে ফোনে এ তথ্য জানান। তার দাদা ওয়াহেদ আলী ও দাদী কদরবানু’র কবরে লাশ আছে কি-না জানতে চান? পরিবারের লোকজন ছুটে গিয়ে দেখেন, দু’টি কবরেই দুই-আড়াই ফুট করে গর্ত (ফাঁকা)। কবরে লাশ নেই! এরপর ছুটে আসেন আত্মীয়-স্বজনও।

এই চক্রের লাশ চুরির ঘটনা শোনে ভাংনামারী ইউনিয়নের হাজী আব্দুল মজিতের পুত্র আবুল হাসাদ বাচ্চু ছুটে যান মায়ের কবরে। কবরের মাথার অংশে দুই-আড়াই ফুট ফাঁকা দেখে চমকে উঠেন। মায়ের লাশ আছো-কিনা নিশ্চিত হতে, গ্রামবাসীকে নিয়ে কবরের মাটি সরিয়ে দেখেন ‘লাশ’ নেই। স্ত্রী’র লাশ নেই এ কথা শোনেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন হাজী আব্দুল মজিত। বাচ্চু জানায়, তার মা নুর জাহান বেগম প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান। মায়ের শোক ভুলতেই পারছেন না, এবার মায়ের লাশও নেই। যেখানে দাঁড়িয়ে দিনে দু’বার মোনাজাত করতাম। এলাকার মানবাধিকার কর্মী ফয়সাল ইসলাম জানান, মৃত্যুর পর ‘কবর’কে শান্তির জায়গা বলা হয়, আজ সেই করব থেকে লাশ চুরির ঘটনায়-আমরা বিস্মৃত। গ্রামবাসীর ধারণা, বিশেষধরনের কোনযন্ত্র দিয়ে পুরো লাশ এ ফাঁকা অংশ দিয়েই সহসায় চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে এ চক্রটি।

এরপরেই স্বজনের লাশের সন্ধানে চলে করব খোঁড়াখুঁড়ি। এরপরে কুলিয়ারচর গ্রামের মৃত রুস্তম আলীর স্ত্রী হাসনা আক্তারের কবর খোঁড়ে লাশ পাওয়া যায়নি। তিনি মারা যান প্রায় ২বছর পূর্বে। ৩বছর পূর্বে মারা যান মৃত একিন আলীর পুত্র মোর্শেদ আলী। তার কবরেও লাশ নেই। গজারিয়া গ্রামের কেরামত আলীর পুত্র আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার ভাই আবু চান ও সালেহা খাতুনের কবরেও লাশ নেই। একই গ্রামের মৃত বাছির উদ্দিনের স্ত্রী জুবেদা খাতুনের কবরেও লাশ নেই। তার পুত্র আব্দুল খালেক জানান, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরেও মায়ের কবর মেরামত করেছি। রাসেল আমাকে ছেলে বলে কবর ভেঙ্গে গেছে, তারপর মেরামত করেছি। লাশ নেই, সেটা আগে বুঝতে পারি নাই। গ্রামের লোকজন কবর খোঁড়াখুড়ি শেষে নিশ্চিত করেন ২১টি কবরে লাশ নেই। এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক, মরার পরেও মানুষ শান্তি পাচ্ছে না উল্লেখ করে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুল বারেক জানান, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ভাংনামারী ইউনিয়নের আবুল হাসনাত বাচ্চু জানান, ঘটনার পরপরেই আমরা থাকায় অভিযোগ দায়ের করি। পুলিশ অভিযোগ নিয়েও চিহ্নিত চোরদের গ্রেফতারে কোন উদ্যোগে নেয়নি, আমরা দীর্ঘদিন পরেও স্বজনদের লাশের সন্ধান পাইনি। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন গৌরীপুর উপজেলার সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, এতো লাশ চুরি হয়েছে, কঙ্কাল ধরা পড়ছে। গ্রামবাসী স্বজনদের চুরির ঘটনায় অভিযোগ দেয়ার পরেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা না নেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।

গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ বোরহান উদ্দিন জানান, ২০১৮সালের এ ঘটনা সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। আপনাদের মাধ্যমে প্রথম জানলাম, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনেকগুলো কবরের লাশ চুরি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা উল্লেখ করে ভাংনামারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মফিজুন নূর খোকা বলেন, জড়িতদের বিষয়ে পরবর্তীতে প্রশাসন কোন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি।

টি.কে ওয়েভ-ইন