করোনাভাইরাস : যা সবকিছুকেই হুমকিতে ফেলছে

বাহাদুর ডেস্ক:

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সকাল। টংগুই নদীর তীরে জমে থাকা বরফ দিয়ে চীনা ভাষায় লেখা একটি বার্তা চোখে পড়ে সবার। বার্তাটি ছিলো সম্প্রতি মারা যাওয়া একজন চিকিৎসককে নিয়ে।

‘বিদায় লি ওয়েনলিয়াং!’

পাঁচ সপ্তাহ আগেই ড. লি’কে উহানে তার হাসপাতালে নতুন ভাইরাস নিয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করায় শাস্তি দিয়েছিলো পুলিশ। পরে তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশটিকে জাতীয় শোক আর ক্ষোভের পরিস্থিতি তৈরি করে। করোনাভাইরাস নিয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য আমাদের জানা নেই।

মানুষের শরীরের আসার আগে এটি প্রাণীতে ছিলো যদিও তাও এখন চূড়ান্ত করা যায়নি যে সেটি কোন প্রাণী। তবে সেই প্রাণী সম্ভব উহানের বাজারে যেখানে বন্যপ্রাণীর বেচাকেনা হতো সেখানে আনা হয়েছিলো। এর বাইরে বিজ্ঞানীরা উৎস থেকে মহামারি ঘটানো পর্যন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে অল্পই বলতে পারছেন।

তবে রোগটির উৎস চিহ্নিত করা নিয়ে এখন ব্যাপক কাজ করছেন তারা। তারপরেও একটি বিষয় সন্দেহের বাইরে। আবিষ্কারের এক মাসের মধ্যেই পুরো চীনা সমাজ ব্যবস্থা ও রাজনীতিকে বড় ধরণের ঝাঁকুনি দিয়েছে করোনাভাইরাস। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ভাইরাস ইতোমধ্যেই তৈরি করেছে চরম বিপর্যয়, কেড়ে দিয়েছে হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ, ক্ষতি করে ফেলেছে বিলিয়ন ডলারের।

পুরো শহর বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় সাত কোটি মানুষ বাসায় কোয়োরেন্টিন হয়ে আছে। পরিবহন বন্ধ এবং কারও বাড়ির বাইরে যাবারও অনুমতি নেই বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। এবং এটা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বরূপ উন্মোচন করেছে যেভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাপক এবং চরম ক্ষোভের সময় সেন্সরশিপ কাজ করে। এখন এর পরিণতি কি সেটি কারও জানা নেই। তারা কি মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে এবং পারলে তাতে কতটা সময় লাগবে?

বিশ্বজুড়ে কেউই নিশ্চিত না যে কিভাবে নিজ দেশে অল্প কয়েকজন আক্রান্ত হওয়ার পর কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো। মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। তবে প্রমাণ বলছে যে শুরুর দিকে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সিজনাল ফ্লুতেও সাধারণ মৃত্যু হার কম হয় কিন্তু দেখা গেলো এটি বিশ্বজুড়ে মানুষকে আক্রান্ত করছে।

তবে এখনো লাখ লাখ মানুষ এ ধরণের ফ্লুতে আক্রান্ত হয়। শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিলো যে নতুন ভাইরাস প্রাণঘাতী কোনো ফ্লু। তবে এখন বলা হচ্ছে এটি আরও মারাত্মক এবং যারা সংক্রমিত হবে তাদের অন্তত এক শতাংশ প্রাণ হারাতে পারে। তবে ঝুঁকিটা বেশি আসলে বয়স্কদের জন্য এবং যারা অসুস্থ তাদের জন্য। কিন্তু এই মহামারীকে কেন্দ্র করে চীনের অভিজ্ঞতায় দুটি বিষয় বেরিয়ে এসেছে।

প্রথমত, স্বাস্থ্য সেবার ভয়ংকর অবস্থা যেখানে জনসংখ্যার বিরাট একটি অংশ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা আছে। উহানে কয়েকদিনের মধ্যে নতুন দুটি হাসপাতাল করা হয়েছে আবার বড় স্টেডিয়াম ও হোটেলকে বানানো হয়েছে কোয়ারেন্টিন জোন। কিন্তু এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও বহু মানুষ চিকিৎসা পেতে সংগ্রাম করছে, ফলে ঘরেই মারা যাচ্ছে অনেকে। এমনকি মৃতদের অনেকে তালিকার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত এ ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে যে যেকোনো নতুন ভাইরাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা মনে করে স্বচ্ছতা ও আস্থার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে বিশেষ করে মানুষকে সঠিক তথ্য জানানো ও সময়মত সরকারের ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় যেখানে কড়া সেন্সরশিপ কাজ করে ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

চীন যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটি অনেকটা আতঙ্কের মতো- যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোয়ারেন্টিন এবং নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজনীয় ছিলো সেগুলো আসলে জটিলতায় পড়েছে। বহু প্রমাণ আছে যে কিভাবে কর্তৃপক্ষ সতর্কতাগুলোকে এড়িয়ে গেছে।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে উহানের একনজর স্বাস্থ্যকর্মী নিউমোনিয়ার একটি অস্বাভাবিক লক্ষ্মণ দেখতে পান যেগুলো উহানের বণ‍্যপ্রানীর বাজারের সাথে সম্পর্কিত ছিলো। গত ৩০শে ডিসেম্বর ড. লি ওয়েনলিয়াং একটি প্রাইভেট মেডিকেল চ্যাট গ্রুপে তার উদ্বেগগুলো শেয়ারে করেছিলেন। তার সহকর্মীদের নিজেদের সুরক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।

তিনি সাতটি রোগী পেয়েছিলেন যাদের লক্ষ্মণগুলোর সাথে সার্সে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষ্মণে মিল ছিলো। কয়েকদিন পর পুলিশ তাকে ডেকে নেয় এবং তিনি অবৈধ আচরণ করেছেন বলে লিখিত নয়। তবে ঘটনাটি জাতীয় গণমাধ্যমে জায়গা করে নেয়। টিভিতে রিপোর্ট হয় যে, উহানে আট জনের বিরুদ্ধে ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে। যদিও কর্তৃপক্ষ অসুস্থতা ছড়ানোর বিষয়টি জানতো।

ড. লি তার মেসেজ পোস্ট করার পরদিন চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানায় এবং এর একদিন পর সন্দেহজনক বাজারটি বন্ধ করে দেয়। অথচ কয়েকটি ঘটনার পরেও এবং মানুষ থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হওয়ার পরে কর্তৃপক্ষ মানুষকে সুরক্ষা তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। চিকিৎসকরা এর মধ্যেই কোয়ারেন্টিন কক্ষ তৈরি করেছে এবং আরও রোগী আশংকা করছিলেন অথচ উহানে তখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ ছিলো। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা ভাইরাসটির কথা উল্লেখই করেননি।

দেশটির ন্যাশনাল হেলথ কমিশন বারবার বলছিলো সংক্রমণের ঘটনা সীমিত এবং মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার প্রমাণ নেই। ১৮ই জানুয়ারি উহান কর্তৃপক্ষ বড় কমিউনিটি সমাবেশের আয়োজন করে যেখানে প্রায় ৪০ হাজার পরিবার ছিলো। সেখানে রেকর্ড পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হয়। দুদিন পরেই চীন নিশ্চিত করে যে ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।

পরদিন চীনের নতুন চান্দ্রবর্ষের নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নিয়েছিলেন হুবেই প্রদেশের সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে যদিও পরে তা ডিলিট করতে হয়েছে। তবে ওই রিপোর্টেই বলা হয়েছে যে অনেককেই অসুস্থ লাগছিলো।

‘নিউমোনিয়ার ভয়কে জয় করে নেতাদের প্রশংসা করে তারা’।

পরে ২৩শে জানুয়ারি যখন শহরটি বন্ধ করা হলো ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। মহামারী তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নতুন বছর উপলক্ষে বাড়ি বা অন্যত্র যেতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ শহর ছাড়ে। পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। লি ওয়েনলিয়াং কাজে ফিরেছিলেন পরে এবং বুঝতে পারেন যে তিনি নিজেও সংক্রমিত হয়েছেন। এ মাসেই মারা যান তিনি অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে রেখে।

এমনিতেই সময়মত সতর্ক করতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ক্ষোভ চরমে উঠেছিলো। এর মধ্যে উহানের রাজনীতিকরা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়ী করতে শুরু করেন এবং পাল্টা অভিযোগ আসে কর্মকর্তাদের দিক থেকে। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, যিনি তার সহকর্মীদের রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তাদের ক্ষোভের লক্ষ্য ছিলো সামগ্রিক ব্যবস্থা। ক্ষোভ এমন পর্যায়ে যায় যে চীন মনে হচ্ছিলো দ্বিধাগ্রস্ত, কোনটি সেন্সর করবে আর কোনটি রাখবে।

#আইওয়ান্টফ্রিডমঅফস্পিচ দেখা হয়েছে বিশ লাখ বার, যদিও পরে সেটিও ব্লক করে দেয়া হয়েছে। জনগণের আবেগ দেখে পার্টিও ড. লি’র প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করে এবং তাকে জাতীয় বীর হিসেবে আখ্যায়িত করে। চীনের শাসকগোষ্ঠী, যাদের কখনো ব্যালটের মুখোমুখি হতে হয়না, তাদের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর একটি পুরনো ভয় কাজ করে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, রোগ রাজতন্ত্রকে একটা ঝাঁকুনি দেয় কারণ অদৃশ্য সংকটের বিপদের একটি ঐতিহাসিক দিকও আছে।

তারা জানে চেরনোবিল কি পরিণতি নিয়ে এসেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসক কমিউনিস্ট পার্টির জন্য। কিন্তু একটি বিষয় অবশ্য কিছুটা ইঙ্গিত দেয় যে, সচেতনতা আগের চেয়ে বেড়েছে এই ঝুঁকি নিয়ে আর সেই ইঙ্গিত আসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভূমিকা থেকে। চলতি সপ্তাহে তিনি বৈঠক করেছেন করেছেন স্বাস্থ্য কর্মীদের সাথে, যারা নতুন ভাইরাস মোকাবেলায় কাজ করছেন। তিনি হাসপাতাল ও বেইজিংয়ের ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রেও গেছেন।

অন্যদিকে তার প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের উহানে পাঠিয়েছেন ও স্পেশাল ওয়ার্কিং গ্রুপ করে তার প্রধানকে নিয়োগ দিয়েছেন এই মহামারী মোকাবেলায়। চীনা রাজনীতি বিশেষজ্ঞ জুডে ব্লানচেট বলছেন, “প্রেসিডেন্ট নিশ্চিতভাবে উদ্বেগের মধ্যে। সেটাই তার চেহারায় ফুটে উঠেছে”। যদিও সেন্সরশিপ আরও প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন মিডিয়ায় ওপর আরও নিয়ন্ত্রণের আদেশ দিয়েছেন শি।

বিবিসি সংবাদদাতা কথা বলেছেন চেন কিউশির সাথে, যিনি একনজর ব্লগার ও উহানে গিয়েছিলেন প্রকৃত অবস্থা দেখার জন্য। তার ভিডিও ব্যাপক প্রচারিত হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে হাসপাতালগুলোর কভারেজ রাষ্ট্রীয় মিডিয়া দিচ্ছে কিন্তু সেখানে ওয়েটিং রুমগুলোতে ব্যাপক ভিড় আর লাশবাহী ব্যাগ।

তিনি বলছিলেন, “কড়া সেন্সরশিপ আছে এবং অনেকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে”। এরপর থেকে মিস্টার চেনের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার পরিবারের ধারণা তাকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে তাকে চুপ করে রাখার জন্য।

চীনের নেতারা এখন তাদের ভাগ্য দেখছেন প্রতিদিনের সংক্রমণ তালিকা থেকে যা প্রতি শহরে, প্রতি প্রদেশে প্রকাশিত হচ্ছে। তবে তাদের অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে , ধীরে হলেও কাজকর্ম শুরু হয়েছে দেশটিতে। খুব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কোয়ারেন্টিন কঠোরভাবে মানা হচ্ছে তবে অন্য জায়গায় কর্মীরা কাজে ফিরতে শুরু করছে। যদিও তাদেরকেও মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে।

তবে বিপর্যয়ের মাত্রা ও বিশ্বকে হুমকিতে ফেলে দেয়া এ বিপর্যয় থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বেরিয়ে এসেছে। হাজার হাজার মানুষ পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন, লাখ লাখ মানুষ কোয়ারেন্টিনে, কর্মী ও ব্যবসায়ীরা বিশাল ক্ষতির মুখে। টংগুই নদীর তীরে লি ওয়েনলিয়াংয়ের প্রতিকৃতি ঠিকই আছে। মানুষ গিয়ে ছবি তুলছে, কথা বলছে একে অন্যের সাথে। একটি পুলিশের গাড়ি দেখা গেলো। তবে শিগগিরই উষ্ণ আবহাওয়াতে চরিত্রগুলোর পরিবর্তন হবে। সূত্র : বিবিসি।