করোনাকালে কতটা ভালো আছে বাংলাদেশের নন এমপিও শিক্ষক ও তার পরিবার

 

মোখলেছুর রহমান, গৌরীপুর(ময়মনসিংহ) ঃ মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে একত্রে বসবাস করে আসাই হলো মানুষের কাজ। কিন্তু নির্দিষ্ট একটা বিষয়ের জন্য যদি মানুষের মধ্যে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হয় তখন আর মানুষ সামাজিক জীবে অবস্থান করেনা। তখন সে হয়ে উঠে একটা ভিন্ন জগতের প্রাণীতে। আর সে জগতটাও তার জন্য হয়ে উঠে নরক যন্ত্রণার মতো। যারা এই সামাজিক বৈষম্যের শিকার তারা হয় নিজেকে নাহয় নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে একটা অগ্নিদগ্ধ নিশ্বাস নির্গত করে।

বলছিলাম বাংলাদেশের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নন এমপিও শিক্ষকদের প্রসঙ্গে। এক দেশে দুই নীতি, এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারেনা। একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক অথচ মাস শেষে একজন বেতন পেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন আর অন্যজন প্রতিষ্ঠান থেকে যৎসামান্য সম্মানী পেয়ে (যা অনেকের জন্য প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ভাড়াও হয়না) তীর্থের কাকের মতো এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে থেকে ক্লাসে শুধু জ্ঞান বিলিয়ে যাবেন তা হয় না। বর্তমান সমাজে এমপিওভুক্ত একজন শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা আর নন এমপিও একজন শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা ভিন্ন পাল্লায় মাপা হয়। অথচ দু’জন শিক্ষকের সার্টিফিকেটই সমান।

আমরা কথায় বলি, ′′শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।” এখন কথা হলো-এই মেরুদণ্ড যার হাতে তিনিই যদি সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারেন তাহলে মেরুদণ্ড টিকে থাকবে কী করে? সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে একজন শিক্ষক কখনও তার ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারেন না। দারিদ্র্য যদি তাঁর গলায় কাঁটা হয়ে আটকে থাকে তাহলে তিনি যে বুলি আওড়াবেন তা কখনোই কারো জন্য বোধগম্য হবেনা।
তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছেন,

হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের করা হাতুড়িকে আজ হানো।
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।।

আজ বাংলাদেশে যেসকল শিক্ষক নন এমপিও হিসেবে শিক্ষকতা করছেন তাদের অবস্থা অনেকটা উক্ত কবিতার শেষ দুই চরণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তাদের জীবনমান ও সামাজিক মর্যাদা এতোটাই নিচে যে, তারা কোথাও নিজেদের পরিচিত করতে পারেননা। তারাও যে সমাজের অন্যান্য চাকরিজীবীদের মতো হেসে খেলে দিন পার করবে সে সুযোগ নেই। তাদের আজ এমন অবস্থা হয়েছে যে, সৌখিন জীবনের সন্ধান পরে হবে আগে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকি।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। পরবর্তীতে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একযুগে জাতীয়করণ করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছেন। কিন্তু এখন সারাদেশে প্রায় ৫২৪২টি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা সময়ের দাবি। যেহেতু এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একাডেমিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে তাই সকল শর্ত ব্যতিরেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির আওতায় আনা হোক। কেননা, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও তার পরিবারের লোকজনের জীবন চলার পথটা অনেকটাই কন্টকাকীর্ন।
কারণ হাজার স্বপ্ন নিয়ে একজন নন এমপিও শিক্ষক শিক্ষকতা নামের এই মহান পেশায় নিয়োজিত হন। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তির করাল গ্রাসে সেই শিক্ষকের জীবন প্রদীপ অস্তমান চাঁদের মতো শুন্যে মিলিয়ে যায়। হাতড়াতে থাকেন স্বাভাবিক জীবন চলার কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্রে। তিনি পারেননা তার পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে সুস্থ জীবন ধারণ করতে। কেননা, জীবনের সর্বত্রই যে অর্থের প্রয়োজন। তাঁরও অন্যান্য দশ জনের মতো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। অধিকার আছে তাঁর সন্তানদের ভালো স্কুলে লেখাপড়া করোনোর। সেই সাথে কর্তব্যও রয়েছে ঘরে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার।
কিন্তু মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই নন এমপিও শিক্ষক সমাজ শুধু অপেক্ষার প্রহর গুণেই আসছেন।

আজ বাজারে গেলে দেখা যায়, একজন নন এমপিও শিক্ষক দূর থেকে ভালো মাছগুলোর দিকে শুধু চেয়েই থাকেন। কিনে আনার সাহস করতে পারেননা। ভালো একটা পোশাকও পর্যন্ত গায়ে দিতে পারেননা। নিজে বুঝলেও সন্তানদের তো আর বুঝানো যায় না। যেসকল শিক্ষকদের ঘরে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে রয়েছে তাদের অনেকেই অভাবের তাড়নায় অপুষ্টিতে ভুগছে।

এমনই একজন নন এমপিও শিক্ষক হাফিজুর রহমান (ছদ্মনাম)। তিনি একটা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। শিক্ষকতা ছাড়া আরো অন্যান্য সরকারি চাকরির জন্য বহু জায়গা থেকে তার অনুরোধ আসলেও তিনি এই শিক্ষকতা পেশাতেই রয়ে গেলেন। তবে তিনি যেখানে চাকরি করেন সেই প্রতিষ্ঠানটি আবার এমপিওভুক্ত (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) হয়নি। যারা হাফিজুর রহমানকে এ চাকরি দিয়েছিলেন তারা বুঝিয়েছিলেন যে, কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আওতায় চলে আসবে। কিন্তু যায়যায় করে বারোটা বছর চলে গেলেও আজও হাফিজুর রহমানের প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়নি।
এদিকে ঘরে তার অসুস্থ বাবা-মা। প্রতি মাসেই তাদেরকে প্রায় দুই-তিন হাজার টাকার ঔষধ কিনে দিতে হয়। রয়েছে কচি কচি দুইটা সন্তান। ছেলেটা ক্লাস থ্রিতে পড়ে আর মেয়েটা কেবল কথা বলা শুরু করছে। তবুও নাহয় প্রতিষ্ঠান থেকে যৎসামান্য সম্মানী যা পেতো আর বিভিন্ন কোচিং প্রাইভেট পড়িয়ে যা আসতো তা দিয়ে খুব ভালোভাবে না হলেও মোটামুটি চলতে পারতো। কিন্তু বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আক্রমণ করার পর থেকে সরকার সকল স্কুল-কলেজ প্রায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে দেয়। এতে করে হাফিজুর রহমানের মাথায় বাজ পড়ে। আগের মাসের যা কিছু জমানো টাকা-পয়সা ছিলো সব ঘরে বসে খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছিলো এই আশায় যে, সামনের মাসে হয়তো প্রতিষ্ঠান খুলবে। কিন্তু খুলে খুলে করে যখন ছয় মাস চলে যায় তখন হাফিজুর রহমান চোখে অন্ধকার দেখে। নিজেরা নাহয় না খেয়ে পড়ে থাকা যায় কিন্তু ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মা ও অবুঝ শিশুদেরতো আর না খাইয়ে রাখা যায়না। তাই যারতার কাছ থেকে টাকা-পয়সা ধার নিয়ে সংসারের খরচ চালাতে থাকে। কিন্তু কথায় আছে, ′′বসে বসে খেলে রাজার ভাণ্ডারও একদিন শুন্য হয়ে যায়।” কলেজ শিক্ষক হাফিজুর রহমানের এখন সে অবস্থা হয়েছে। কারো কাছেই তিনি এখন আর টাকা চাইতে পারেননা। অবশেষে তিনি বাবা-মা ও সন্তানদের কথা ভেবে টাকা উপার্জনের একটা পথ খুঁজে বের করেন। তিনি অনেক দূরে শহরে গিয়ে রিক্সা চালিয়ে সংসারের খরচ চালাবেন। যদিও তার আত্ম-সম্মান ও বিবেকের কাছে মাথা নত করে বিষয়টা। কিন্তু এছাড়া তার কি আর করার আছে?

না, এটা কোনো গল্প সিনেমা নয়। এবং এটাই একটা চিরন্তন সত্য। কলেজ শিক্ষক আজ টাকার জন্য রিক্সা চালিয়ে জীবন ধারণ করছেন।
বাংলাদেশে এরকম হাজার হাজার নন এমপিও শিক্ষক এই করোনা মহামারি চলাকালীন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কেউ প্রকাশে আছে আর কেউ আড়ালে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানা যায়, পরিবারের খরচ চালাতে অনেক নন এমপিও শিক্ষক সবজি বিক্রি করে, চা বিক্রি করে, মাটি কাটার দলে যোগদান করে জীবীকা নির্বাহ করছেন আবার অনেকেই অভিশপ্ত জীবনকে একেবারে মুক্তি দিয়ে আত্মহননের পথ বেঁচে নেয়।
এরকম কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো- ′′অভাবের তাড়নায় তিন সন্তানকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যা।”- (Dumdakka.com ১০জুন/২০১৭)। ′এমপিওভুক্ত না হওয়ায় হতাশ শিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার′′ (B R 24.com ২৭জুন/২০২০)।
সেদিন ফেসবুকে দেখলাম ফুলের মতো সুন্দর একটি মেয়ে হাতে একটি প্লেকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। সেই প্লেকার্ডে লেখা রয়েছে-
′′আমার বাবা নন এমপিও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বুদ্ধি হওয়ার পর হতে দেখে আসছি তিনি কোনো বেতন পাননা। জানিনা তাঁর অপরাধটা কী? যদি তার কোনো অপরাধ না থেকে থাকে তবে দয়া করে অনতিবিলম্বে তাঁরসহ তাঁর মতো অসহায় এদেশের সকলের এমপিও’র ব্যবস্থা করে দিন এবং আমাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিন।”

এইযে মানবিক আবেদনটি, এটি কার না হৃদয়ে সাড়া দেয়। এই শিশুটি হয়তো জানেনা ইংরেজি এমপিও’র বাংলা প্রতিশব্দ কী? তবে এটা জানে যে, তার বাবা চাকরি করে কিন্তু বেতন পায়না। এই শিশুটি যে ছোটকাল থেকেই একটা নেতিবাচক চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠছে এর বিরোপ প্রভাবের দায় কে নেবে? এই শিশুটির মতো হাজারো শিশু রয়েছে যাদের বাবা-মা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে কিন্তু বেতন পায়না। তাই অন্তত এসব কোমলমতি শিশুদের কথা ভেবে হলেও দেশের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিনা শর্তে এমপিওভুক্তির আওতায় আনা হোক। মুজিব বর্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটাই একমাত্র চাওয়া।

মোখলেছুর রহমান
প্রভাষক (বাংলা)
সোহাগী ইউনিয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ।
স্টাফ রিপোর্টার (অনলাইন নিউজ পোর্টাল
দৈনিক বাহাদুর)
গৌরীপুর, ময়মনসিংহ।