একদিকে মেরামত অন্যদিকে ভাঙন : গৌরীপুরে এক সড়ক ৩বার মেরামত!

মোখলেছুর রহমান, গৌরীপুর প্রতিনিধি :
ময়মনসিংহের গৌরীপুর-বেখৈরহাটি সড়ক সংস্কার ও মেরামত প্রকল্পের কাজ চলমান অবস্থাতেই একদিকে চলছে মেরামত আর অন্যদিকে ভাঙছে। নুতন সড়কে তিন’দফায় দেয়া হয়েছে ৮৪টি স্থানে জুড়াতালির পট্টি। দেবে গেছে সড়ক, মাটি না কাটায় ভাঙছে সড়ক, নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে উঠে যাচ্ছে রাস্তার পাথর! সিকিউটি উত্তোলনের (ঠিকাদারের জামানত উত্তোলন মেয়াদ) মেয়াদের আগে বারবার মেরামত ও সংস্কারে এলাকাবাসী বিস্মৃত!

শুক্রবার (৮ জানুয়ারি/২০২১) এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী আবু সালেহ মোঃ ওয়াহেদুল হক সাংবাদিকদের জানান, যেখানে ত্রুটি-বিচ্ছুতি আছে সেগুলো ঠিক করা হচ্ছে। আরো যেসব স্থানে লাগবে সেগুলোতেও ঠিক করে দেয়া হবে। তবে রাস্তায় নিম্নমানের মাল ব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করেন ঠিকাদার আহাম্মদ আলী। তিনি সাংবাদিকদের জানান, যেসব স্থানে থিকনেস কমে গেছে, সেসব স্থানে সিলকোট করে দেয়া হচ্ছে। এতে রাস্তার কোন ক্ষতি হবে না।

সরজমিনে দেখা যায়, নির্মাণ কাজ করা হয়েছে ধুলাবালি আর কর্দমায়। প্রবল বর্ষণে পানি সেচেও বিটুমিনের কাজ চলমান রাখা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পুরাতন মালামাল ব্যবহার, নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার, সঠিকভাবে প্রাইমকোড- টেককোড না করা ও নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের অভিযোগ। প্রাইমকোড ছাড়াই অধিকাংশ স্থানে মেরামত করায় সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তার পাথর চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ সড়কটি একাধিকবার মেরামত করা হলেও এলাকাবাসী পাচ্ছেন না কাক্সিক্ষত সেবা। এ প্রসঙ্গে অচিন্তপুর ইউনিয়নের শাহগঞ্জের আব্দুল জব্বার জানান, লিখলে লাভ নেই, কয়েকদিন পরে আবারও মেরামত হবে, ভাঙন-আর মেরামত আমাদের নিত্যসঙ্গী।

একদিকে মেরামত আর অন্যদিকে ভাঙন এ সড়ক নির্মাণে নিয়মে পরিণত হয়েছে। মেরামতকৃত নতুন সড়কে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তিন দফা জোড়াতালি দেয়া হয়েছে। এরপরেও উঠে যাচ্ছে রাস্তার পাথর, দেবে যাচ্ছে রাস্তা। জমছে পানি। ভোকেশনালের সামনে ৯টি পয়েন্টে, খেলার মাঠ এলাকায় ৫টি পয়েন্টে, পুর্বদাপুনিয়া ৮টি পয়েন্টে, বালুয়াপাড়ায় ১৭টি নতুন রাস্তা জুড়ে পট্টি দেয়া হয়েছে। নতুন রাস্তা এখন জোড়াতালি’র রাস্তায় পরিণত হয়েছে। তৃতীয় দফায় থিকনেছ কম থাকায় ২২টি স্থানে আবারও প্রলেপ দেয়া হয়েছে। গোলকপুর গ্রামের ব্যবসায়ী রমজান আলী জানান, বৃষ্টির জমা পানির ওপরেই কাজ করা হয়েছে দারিয়াপুর এলাকায়। বালুয়াপাড়া মোড়ে মেরামত প্রসঙ্গে জরিনা আক্তার বলেন, বছরে বছরে কাজ করে। রাস্তা তো আর টিকে থাকে না। নতুন রাস্তায় আবার মেরামত করা হচ্ছে, এটা দুঃখজনক।
জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গৌরীপুর-বেখৈরহাটি জিসি রাস্তা রক্ষণাবেক্ষন ৮হাজার ৬৭৫ মিটার সড়ক সংস্কার ও মেরামত কাজ হয়েছে। এ প্রকল্পের চুক্তিভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোজি ৩০লাখ ১৯হাজার ৩৬৬টাকা। কাজ করছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামির ট্রেডার্স লাল মাহমুদ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ কাজের উদ্বোধন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ এমপি।

অপরদিকে এ দপ্তরের অধিনে এ সড়কের ১৪.০৮৮ কিলোমিটার মেরামত কাজ সম্পন্ন হয় ২০১৬ সালে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কিশোরগঞ্জ স্টেশন রোডের মেসার্স শাহিল এন্টারপ্রাইজ ওই কাজটি করেন। সড়কটি নির্মাণে বরাদ্দ ছিলো ৪ কোটি ২৭লাখ ৬৪হাজার ৬১৬টাকা। এ দপ্তর সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১৫সালের ২৬ এপ্রিল এ সড়কের মেরামত কাজ শুরু হয়। কাজটি সম্পূর্ণ করে ২০১৬সালের ৬ ডিসেম্বর। আরটিআইপি-২ প্রকল্পের অধিনে সম্পন্ন এক বছর যেতে না যেতেই ভাঙন দেখা যায়। ফলে এলাকাবাসী কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। মাত্র ৬মাসের মধ্যে গৌরীপুর-বেখৈরহাটির নূতন সড়ক ভেঙ্গে যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গর্ত আর খানাখন্দক আর সৃষ্ট গর্ত দেখে মনে হয় ‘এ যেন নূতন সড়ক নয়, খাল’! ‘সিকিউরিটি মানি’ উত্তোলনের মেয়াদের আগেই রাস্তার এই বেহাল দশায় পরিণত হয়। মেয়াদ উর্ত্তীণের ৪মাসেই ১৪ কিলোমিটার সড়কের ১২৯ পয়েন্টে ভাঙ্গন দেখা দেয়। সড়কের দু’পাশে মাটি ভরাট না করায় ব্রীজের গার্ডপোস্টও ভেঙ্গে যায়। এ সড়কটি নির্মাণকালে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র নিয়ে একাধিক সচিত্র প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এরপরেও অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছেই!!!

টি.কে ওয়েভ-ইন

Print Friendly, PDF & Email