আর.কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূমি রক্ষায় আবারও ফুঁসে উঠছে গৌরীপুর!

বিদ্যালয়ের ভূমি রক্ষায় আবারও ফুঁসে উঠছে গৌরীপুর! অর্পিত ভূমির দোহাই দিয়ে গৌরীপুর আর.কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভূমিতে নতুন ভবন নির্মাণ বাঁধাগ্রস্থ করার পাঁয়তারা-এলাকায় নিন্দার ঝড়

প্রধান প্রতিবেদক, গৌরীপুর অঞ্চল :
ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর (আর.কে) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভূমিতে ছয়তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণে একটি ভূমিদস্যু চক্রের যোগসাজশে প্রশাসনের অবৈধ হস্তক্ষেপে বাঁধাগ্রস্থ করার পায়তারা-শহরে আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়ের ভূমি নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর অনাঙ্খিত বাড়াবাড়িতে এলাকায় নিন্দা, ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে প্রতিবাদের ঝড়।
এ দিকে প্রিয় বিদ্যাপীঠের জমি রক্ষায় আবারও ফুঁসে উঠছে বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনের অবৈধ হস্তক্ষেপ, ভূমিদস্যুদের অবৈধ থাবা রুখে দিতে মঙ্গলবার ১৪ জানুয়ারি মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে বিদ্যালয়ের সাবেক ব্যাচভিত্তিক শিক্ষার্থীরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে ১৯২০সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে তৎকালীন জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ৯৩৬নং দলিলমূলে নিষ্কর ও ক্ষতিপূরণ অযোগ্য ঘোষণায় ১০.৬২একর ভূমি লিখে দেন। এ ভূমি বিদ্যালয়ের নামে দিয়ে তিনি ১৯১১সালের ১০জুলাই তার বাবার নামে এই বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯৪০সালে জরীপে সিএস রেকর্ডে বিদ্যালয়ের নামে ১০.৬২একর ভূমি রেকর্ডভূক্ত হয়। অথচ আর.ও.আর রেকর্ড জরীপে ১৯১১সালের বিদ্যালয়ের বিদ্যমান ভবনসহ বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়নি। এতদবিষয়ে মামলা করে বিদ্যালয় কর্তৃকপক্ষ ডিক্রীপ্রাপ্ত হয়। এরপর ১৯৮৪সালের জরীপে বিআরএস রেকর্ডে গৌরীপুর মৌজায় ৭.১৬একর ও দাপুনিয়া মৌজায় ৩.৪৬ একর জমি গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ডভূক্ত হয়। ভূমি জরীপকারী মোঃ রিয়াজ উদ্দিনের ২০১৫সালের ৭জুলাই তারিখে প্রস্তুতকৃত কলমী নক্শা অনুযায়ী জানা যায়, নির্মানাধীন ভবন হচ্ছে গৌরীপুর মৌজার সিএস ৬৬৮ ও ৬৬৯দাগে। যার আর.ও.আর দাগ ১৩৭৩ এবং যার বি.আর.এস রেকর্ডে ২৬৭২ দাগের ৬২.৩১শতাংশের চৌহদ্দির মধ্যে। এ জমি বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ডভূক্ত।


এ দিকে জমিদার কর্তৃক বিদ্যালয়কে প্রদত্ত ভূমি হস্তান্তরের দলিল, সিএস রেকর্ড, মামলার ডিগ্রী এবং বি.আর.এস রেকর্ডভূক্ত গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূমিতে নতুন ভবন নির্মাণে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর এক পত্রাদেশ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে গৌরীপুরে। ‘গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলভূক্ত ভূমিতে বিল্ডিং নির্মানের কাজ শুরু প্রসঙ্গে’ বিষয় উল্লেখ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মাসুদ রানা ৩০ডিসেম্বর প্রধান শিক্ষককে এক পত্র প্রেরণ করেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রেরিত ওই পত্রে অভিযোগ নং ১৮৮২, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কর্তৃক ২৬ ডিসেম্বর তারিখে ৩৪৬নং তদন্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করলেও ওই পত্রে এসব উত্থাপিত অভিযোগপত্র ও তদন্ত প্রতিবেদনের কোন প্রতিলিপি প্রধান শিক্ষককে দেয়া হয়নি। তবে তিনি বিদ্যালয়ের ভূমিকে সরকারি ভূমি আখ্যায়িত করে লিখেন ‘যেহেতু এতে সরকারি স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে সেহেতু উপযুক্ত ভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন সাপেক্ষে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য আপনাকে (প্রধান শিক্ষক) পরামর্শ দেয়া হল। অন্যত্র সরকারি স্বার্থ বিনষ্টের অভিযোগে স্কুল প্রধান দায়ী থাকবেন।’
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোছাঃ লুৎফা খাতুন জানান, আমি এক ফর্দ্দের একটি পত্র পেয়েছি। তার সঙ্গে এ ধরনের কাগজপত্র সংযোজিত ছিলো না। এসব কাগজপত্র চাওয়ার পরেও পত্রবাহক কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
অপরদিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মাসুদ রানা এ প্রতিনিধিকে বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে, এটা গোপনীয় বিষয়, তা প্রকাশযোগ্য নয়।
এদিকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছাঃ লুৎফা খাতুন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে পত্রের মাধ্যমে জানান যে, বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনের স্থান বর্তমান হাল জরীপ অনুযায়ী বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ডভূক্ত। এটি একটি সরকারি বিদ্যালয় এবং সরকারি অর্থায়নে উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান। তাই প্রধান শিক্ষকের পক্ষে উন্নয়ন কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই।
অপরদিকে বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন গৌরীপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোঃ রইছ উদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ের ভূমি নিয়ে কোন অভিযোগ থাকলে সেই অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ বা অভিযোগের বিষয়ে মতামত প্রদানের সুযোগ না দিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধের আদেশ একপেশে হয়েছে। বিদ্যালয়ের আরেক ছাত্র শহীদ পরিবারের সদস্য সাংবাদিক ম. নূরুল ইসলাম প্রশাসনকে প্রশ্ন ছুঁড়েন অভিযোগকারীর স্বার্থ; না সরকারের স্বার্থ দেখলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) তা এই পত্রে বুঝা যায়নি। তিনি আরো বলেন, যদি ভূমি সরকারের হয় তাহলে ভবন সরকারের, টাকা সরকারের আর বিদ্যালয়টিও সরকারী, তা হলে সমস্যাটা কোথায়? কার স্বার্থে কাজ বন্ধ রাখা?
এ দিকে আরো জানা যায়, বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ কালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রাণালয়ের নামে ১৯৯১সালের ২০ অক্টোবর তারিখে ৭৭৪২ নং দলিল মূলে বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি দলিল সম্পাদন করে দেন। যার ফলশ্রুতিতে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হয়। ওই দলিলেও ভবন নির্মাণাধীন ভূমি বিদ্যালয়ের তা উল্লেখ রয়েছে।
অপরদিকে জানা যায়, ভবনের স্থান নির্মাণের জন্য ২০১৭সালের ২৪ অক্টোবর তারিখে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মর্জিনা আক্তারের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ময়মনসিংহ-৩ গৌরীপুর আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ, গৌরীপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ সহকারী প্রকৌশলী (গৌরীপুর) আব্দুল্লাহ আল মাসুম, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডাঃ হেলাল উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক বিধু ভূষণ দাস, সাবেক সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ, সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ ফজর আলী, সাবেক প্রধান শিক্ষক মোঃ তফাজ্জল হোসেন, প্রেসকাব সভাপতি বেগ ফারুক আহাম্মেদ, সাপ্তাহিক রাজগৌরীপুর পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল হোসেন জুয়েল, সাবেক ছাত্র আব্দুল মুন্নাফ, মোঃ আব্দুস সাত্তার, তোজাম্মেল হোসেন, মোঃ আসাদুজ্জামান, আব্দুস সালাম খান, প্রেম নাথ সাহা, মোঃ সোহাগ মিয়া, আবুল গাজী শাওন, সাংবাদিক সুপ্রিয় ধর বাচ্চু, মোঃ হুমায়ুন কবির, মোঃ আরিফ হোসেন, ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ মিজানুর রহমান, পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি উত্তম সরকারসহ শতাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তির অংশগ্রহণে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সর্বসম্মতি সিদ্ধান্তক্রমেই এ ভবনের স্থান নির্ধারণ করা হয়। এরপর উপজেলা প্রশাসন, প্রকৌশল বিভাগ ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র এবং জমির দালিলিক কাগজপত্র দেখে ভবনের নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা করান। ২০১৯সালের ১৮নভেম্বর তারিখে ৬তলা বিশিষ্ট নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্থর উদ্বোধন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ এম.পি। ভিত্তিপ্রস্থর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেঁজুতি ধরও বক্তব্য রাখেন।
অপরদিকে সরকারি দপ্তর, ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এলাকা ও গৌরীপুরবাসীর পক্ষে পৌর শহরের কালীপুর বাজার পশ্চিম লাইনের মোঃ আব্দুল হাফিজ খানের পুত্র মোঃ ইকরাম হোসেন খান মামুন ও মাস্টারপাড়ার কুবের প্রসাদ চৌহানের পুত্র অজিত কুমার চৌহান ‘বাংলাদেশ সরকারের ১নং খতিয়ানের সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষার সুব্যবস্থা গ্রহণের’ জন্য অভিযোগ দায়ের করেন। এ অভিযোগে জমির আর.ও.আর দাগ ১৩৪৮, ১৩৪৯, ১৩৫০, ১৩৫১, ১৩৫২, ১৩৭৩ ও ১৩৭৪ উল্লেখ রয়েছে।
এ দিকে সরজমিনে দেখা যায়, গৌরীপুর আর.কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দলিলকৃত ১৩৫০ ও ১৩৫১ দাগের জমি খাস খতিয়ানে চলে গেলে বিজ্ঞ আদালতে মামলা করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুকূলে ডিক্রীপ্রাপ্ত হন। এ ভূমি নিয়েও কোনরূপ বিরোধ নেই। ক শ্রেণিভুক্ত আরওআর ১৩৫৪দাগ ৪০শতাংশের মধ্যে বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড ১৭শতাংশ ক শ্রেণিভুক্ত রয়েছে। বাকী জমি অন্যদের নামে লিজকৃত ২৩শতাংশ। যা বর্তমান নির্মানাধীন ভবনের সীমানা থেকে প্রায় শত গজ দূরে অবস্থিত। যেখানে ভবন নির্মাণ হচ্ছে তা বিআরএস জরীপের ২৬৭২দাগ। যা বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ডভূক্ত।
অপর একটি সূত্র জানায়, গৌরীপুর পৌর তহসিল অফিসের পৌর ভূমি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম সিরাজী ও একটি চক্র এ বিদ্যালয়ের ভূমি অন্যদের পাইয়ে দেয়ার জন্য মোটা অংকের উৎকোচ নিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে সরকারি বিদ্যালয়ের রেকর্ডকৃত, দখলীয় ভূমিতে এমপি মহোদয়ের ভিত্তিপ্রস্থর নির্মাণের পরেও সরকারি উন্নয়ন কাজ বাঁধাগ্রস্থ করতে এ চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য শফিকুল ইসলাম সিরাজীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।