আজ বাবা নেই-স্মৃতিপাতায় আমার বাবা

বাবাকে হারানোর দুই বছর

মোঃ রইছ উদ্দিন ঃ
বাবা। শব্দটা কঠিন হয়ে গেলো। স্মৃতিপাতায় এখন জন্মদাতার সংলাপগুলো জমে আছে। সাদা দাঁড়িতে স্পর্শ করার সেই বাবা; আজ নেই। চলে গেছেন ১০ সেপ্টেম্বর/১৮, সোমবার। দিনভর সবাইকে হাঁসালেন। হাঁসির মানুষগুলোকে কাঁদিয়ে রাত ১১টা ২০মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহে ….রাজিউন।
মুঠোফোনে আজ আর সেই রিংটোন বাজে না। বাবা লিখা শব্দটাও ভেসে উঠে না। বাবা ছিলেন, সবসময় হৃদয়ের কাছে, জীবনের পাশে। বাবা নামের সেই বটতলার ছায়াতলে ছিলাম। তখন বুঝি নাই। তাই বাবাকে বাবা হিসাবে যা করার হয়তো সেইটুকু করতে পারি নাই। আজ আপসোস লাগে, কেন? বাবাকে জড়িয়ে আরও কিছু সময় থাকতে পারলাম না। এতো ব্যস্ত; সেই ব্যস্ততা আজ কোথায় লুকিয়ে গেলো, ৯দিন তো চলে গেলো হিসাবের জীবন খাতা থেকে, বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারছি না, তারপরেও সময়তো থেমে নেই। চলে যাচ্ছে।
রিস্কা থেকে নেমে ধীর পায়ে এসে সেই চেয়ারটায় আর কোনদিন বসতে আসবেন না। তারপরেও বাবার বয়সী কেউ পরন্ত বিকালে আমার অফিসের দিকে এলেই চমকে যাই, আজ যিনি বিকালে আসবেন, বাবার একটি পাঞ্জাবীর রঙের পাঞ্জাবী পড়ে। সেই ছোট দাঁড়ি, তাকিয়ে ছিলাম; বাবাকে এভাবে কোনদিন কী? তাকিয়ে দেখেছি! বাবা, বাবা বলে আজ চিৎকার করতে ইচ্ছে করে, বাবা তুমি আর একবার এসো। আগের মতো জড়িয়ে ধরো, এ বাঁধন ছিঁড়তে দিবো না। ভালো থেকো বাবা; হে আল্লাহ বাবাকে বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে আসীন করুন। আমীন।
বাবাকে নিয়ে ২০১৪সালের একটি লিখা। যা দৈনিক স্বজনের ২০১৫সালের ২১জুন ছাপা হয়েছিলো। তা আবারও তুলে ধরলাম। আজ রোববার। ২১জুন ২০১৫। জন্মদাতা পিতার সম্মানে আজ বাবা দিবস। এ দিবসে কিছুই লিখা হয়নি। গতবছর যা লিখেছিলাম। প্রকাশ হয়নি তাই আজ প্রকাশ করছি।
আর মাত্র ৪দিন বাকী। বারবার শ্বাস-প্রশ্বাস, বাড়ছে-কমছে। ষাটোর্ধ্ব সেই মানুষ। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। চোখে পানি ঝরছে। বাঁচাও-বাঁচাও বলে কাতরাচ্ছেন। আমি হতবিহ্বল। এ ডাক্তার, ও ডাক্তারকে ফোন দিচ্ছি। ওষুধ বদলাচ্ছি। থামছে না শ্বাসকষ্ট। অসহায় আমরা। বাবার শরীর কাঁপচ্ছে। ঝাপটে ধরেছি আমি। তখন আমিও কাঁদছি। এবারের বাবা দিবসে কী? বাবাকে হারাতে হবে? তবু শান্তনার বাণী শুনিয়ে যাচ্ছি। একটু ধৈর্য্য ধরুন।
পাল্টানো হলো ওষুধ। স্নেহের চোখ। আদরের হৃদয়। ভালোবাসার সেই বাবা আমার চোখের পানি দেখতে পেলেন। আমার শত চেষ্টা ব্যর্থ। নিজের চোখের পানি আড়াল করতে পারলাম না। আমার সঙ্গে যোগ দিলেন আমার সহধর্মিনীও। একটু শান্ত হলো শ্বাসকষ্ট। বাবা বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
পাশে বসেই বাবার স্মৃতি কথা ভেসে আসছিল। গভীর রাত। বাবা আমাদের ঘুমাতে বললেন। আমি পাশেই ঘুমালাম। এভাবেই কেটে গেল ৩/৪টি দিন। এলো রোববার। জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ। ১৬জুন ২০০৪। বাবা দিবস। শ্বাসকষ্টের সেই আক্রমণ এখনও থামেনি। তবে আজকের আক্রমণ মনুষ্যের। যেতে হবে জেলা শহর ময়মনসিংহ। কোর্টের কাটগড়ায় আমি, বাবা আর ভাই, চাচা, চাচাতো ভাইসহ পরিবারের আরও অনেককে নিয়ে হাজির হলাম। আমরা সবাই আসামী। বাদি পক্ষের সাক্ষি হচ্ছে। এ দিন না গেলে বাবার নামে, নিয়ম অনুযায়ী গ্রেফতারি পরোয়ানা হতো। এ জন্যই বাবাকে নিয়ে গেলাম। সোজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। শ্বাসকষ্টে কাঠগড়ায় ঠিকতে পারছিলেন না।


চোখ এড়ালো না বিজ্ঞ বিচারক জনাব নাঈম ফিরোজের, তিনি উপলদ্ধি করলেন। মমতা, মানবিক আর ন্যায় বিচারের যিনি কাণ্ডারি। আদেশ দিলেন কাঠগড়া থেকে বেড়িয়ে যেখানে ভালো লাগে এমন স্থানে বসতে। নিচে নেমে, একটি বেঞ্চে বসলেন। তখনও শ্বাসকষ্ট থামছে না।
এরপূর্বেই আমার মনুষ্যত্ব শূন্যের কোটায়। বনের হিংস্র পশুর মতো চিন্তা করতে লাগলাম। প্রতিহিংসা মনের ভিতর প্রতিশোধের স্পিহা জাগিয়ে তুলল। কিছু না করেই যদি এখানে আসতে হয়, কিছু করে আসব! বাবার শরীর কঙ্গালসার। শ্বাসকষ্টের আক্রমণে নুয়ে পড়েছে জীবনটা। যে মানুষটা মঞ্চে উঠে উচ্চ কন্ঠে নাটকের সংলাপ দেন, সেই মানুষটি কোন কথা বলতে পারছেন না। পাশে ডায়াবেটিকসে আক্রান্ত চাচা নুরে শেখ জালাল উদ্দিনের একই অবস্থা। দীর্ঘ সময় সাক্ষির জেরা হলো। আমরা সবাই কাঠগড়া থেকে নেমে এলাম। সেদিন ভুলে গেলাম, বাবাকে উপহার দেয়ার বিষয়টি।
নিচে নেমে চা পান শেষে সবার সাথে নানা বিষয়ে কথা হলো। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে পশুত্ব ভাবনা এসেছিল, তা মুছে যেতে লাগল। বাড়িতে এসে সব ভুলে গেলাম। সন্ধ্যায় বাবার জন্য একটি নূতন লুঙ্গি কিনে উপহার দিলাম। বাবা বললেন, আমারতো অনেক লুঙ্গি আছে। কেন এনোছো, বাবা জানে না, আজ বাবা দিবস।