অর্ধশত চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত : সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে ডাক্তার নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা

দুই দিনে মারা গেছেন ১১ জন, শনাক্ত ৪২৮ জন ৩ হাজার ডাক্তার ও ৫ হাজার নার্স প্রস্তুত রাখার পরামর্শ বিএমএর বেসরকারি হাসপাতালে কিট সরবরাহ করতে হবে

আবুল খায়ের

করোনায় সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা। ইতিমধ্যে অর্ধশত চিকিত্সক এবং প্রায় সমসংখ্যক নার্স করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গত দুই দিনে সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিনসহ ১১ জন করোনায় মারা গেছেন। দুই দিনে নতুন শনাক্ত হয়েছে ৪২৮ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সবার আগে চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ডাক্তারদের আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সেবা দেবে কারা? আগামী সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য খুবই ক্রিটিক্যাল বলে আবারও সতর্ক করে দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেছেন, এই সময়ে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। মানুষকে ঘরে রাখতে হবে। করোনা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বেকার ডাক্তার-নার্সদের মধ্য থেকে তিন হাজার ডাক্তার ও ৫ হাজার নার্স প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)।

সংগঠনের মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, করোনা রোগীদের চিকিত্সায় চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। তিন শিফটে ডাক্তারদের চিকিত্সাসেবা দিতে হবে। সব ডাক্তারের এক সঙ্গে যাওয়ার দরকার নেই। আর যেহেতু করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে, তাই বেকার ডাক্তার-নার্সদের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখতে হবে। যাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।

এদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিত্সাসেবা বন্ধ হতে চলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা শনাক্তরণ কিট দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এখনো দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে মগবাজারের ইনসাফ কিডনি হাসপাতাল লকডাউন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবি এম আব্দুল্লাহ বলেছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সেবা চালু রাখতে হবে। এক্ষেত্রে কিট দিয়ে তাদের সহযোগিতা করা যেতে পারে।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিত্সক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সোমবার রাতে তাকে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সোমবার রাতেই তার নমুনার ফলাফল পজিটিভ হয় বলে জানা যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন নারী চিকিত্সক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে হাসপাতালের দুজন চিকিত্সক এবং একজন রেডিওলজিস্ট করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গত শনিবার নারায়ণগঞ্জ জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ এবং করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জেলার ফোকাল পার্সন ও উপজেলা মেডিক্যাল অফিসার ডা. জাহিদুল ইসলামসহ পাঁচ জন ডাক্তার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

গতকাল একজন চিকিত্সকসহ আরো চার জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫০ জন। বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরো ২১৯ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২৩১ জন হয়েছে। গত এক দিনে নতুন করে সেরে উঠেছেন আরো সাত জন। সব মিলিয়ে মোট ৪৯ জন এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে যুক্ত হয়ে দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির এই সবশেষ তথ্য তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট ১ হাজার ৭৪০টি নমুনা পরীক্ষা করে ২১৯ জনের সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত মোট পরীক্ষা হয়েছে ১৪ হাজার ৮৬৮টি নমুনা। তিনি বলেন, যে চার জন মারা গেছেন, তাদের দুজনের বয়স ৭০ এর বেশি। এক জনের বয়স ৫০, আরেক জনের বয়স ৩৫-এর বেশি। তাদের মধ্যে তিন জন পুরুষ, এক জন নারী। ৩৫ বছরের বেশি বয়সের যিনি মারা গেছেন, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন, পাশাপাশি নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছিল। এদিকে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০৯ জন আক্রান্ত হন, মৃত্যুবরণ করেন সাত জন।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের সেবায় ফ্রন্টলাইনে থাকা চিকিত্সক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ত্যাগের যেন শেষ নেই। মারাও যাচ্ছেন অনেকে। শুধু ইতালিতেই মারা গেছেন শতাধিক চিকিত্সক। এছাড়া প্রায় প্রতিটি দেশেই করোনাযুদ্ধে হেরে চিকিত্সকদের লাশের মিছিল বাড়ছে। বিদেশে কর্মরত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি চিকিত্সকও মারা গেছেন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে। সর্বশেষ মারা গেছেন পূর্ব লন্ডনে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিত্সক ডা. আব্দুল মাবুদ চৌধুরী (ফয়সাল)। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্কে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মোহাম্মদ ইফতেখার উদ্দিন ও রেজা চৌধুরী নামে বাংলাদেশি দুই চিকিত্সক। তবে ডা. মঈন উদ্দিনই প্রথম কোনো বাংলাদেশি চিকিত্সক যিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে নিজ দেশে মারা গেলেন।

চিকিত্সক নার্সদের জন্য ১৯ হোটেলের তালিকা

রাজধানীর ছয়টি হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা সেবাদানকারি ডাক্তার, নার্স ও অন্য সদস্যদের অবস্থান/কোয়ারেন্টাইনের জন্য রাজধানীর ১৯টি আবাসিক হোটেল বরাদ্দের চুক্তির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিষয়টি জানিয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মো. আমিনুল হাসান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দিয়েছেন। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। চিঠিতে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্স অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবাদানকারী সদস্যের জন্য নির্ধারিত ১৯টি হোটেলের নামসহ প্রয়োজনীয় কক্ষের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। ছয়টি হাসপাতালের সেবাদানকারীদের জন্য নির্ধারিত হোটেলগুলো হচ্ছে—ঢাকা রিজেন্সি, হোটেল অবকাশ, হোটেল জাকারিয়া, হোটেল রেনেসাঁ, রেডিসন ব্লু, সোনারগাঁ, লেকভিউ ও লা মেরিডিয়ান, হোটেল মেলোলিফ, হোটেল মিলিনা, গ্রান্ড প্রিন্স, হোটেল শ্যামলী, হোটেল ড্রিমল্যান্ড, রাজমনি ঈশা খাঁ, ফারস হোটেল ও হোটেল ৭১। হোটেল সাগরিকা, হোটেল গ্র্যান্ড সারকেল ইন এবং হোটেল শালিমারের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক